বাংলাদেশ

র‍্যাব বিলুপ্ত নাকি পুনর্গঠন?

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ ০৩:৩৯

বাংলাদেশের এলিট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্ত হবে নাকি নতুন কাঠামোয় পুনর্গঠন করা হবে—এ প্রশ্ন আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে। মানবাধিকার ইস্যু, আন্তর্জাতিক চাপ, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ এবং সাম্প্রতিক প্রশাসনিক তৎপরতা ঘিরে বাহিনীটির ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে চলছে নানা আলোচনা।

সম্প্রতি র‍্যাবের জন্য নতুন অপারেশনাল যানবাহন কেনার সরকারি অনুমোদন প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, যদি বাহিনীটি বিলুপ্তির পথে থাকে, তাহলে নতুন সরঞ্জাম কেনা হচ্ছে কেন? আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এটি র‍্যাবকে নতুনভাবে সাজানোর ইঙ্গিত হতে পারে।

তবে এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে র‍্যাব বিলুপ্তির কোনো ঘোষণা আসেনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় একটি বিশেষায়িত বাহিনী রাখার পক্ষে সরকারের ভেতরে মত রয়েছে। তবে মানবাধিকার বিতর্ক এড়াতে বাহিনীটির কাঠামো, দায়িত্ব ও কার্যক্রমে পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

২০০৪ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় র‍্যাব গঠনের পর থেকেই বাহিনীটিকে ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়। বিশেষ করে ‘ক্রসফায়ার’, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো বারবার উদ্বেগ জানায়। পরে এসব অভিযোগ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গুরুত্ব পায়।

২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে কয়েকটি আলোচিত গুমের ঘটনায় আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়ে। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীসহ একাধিক ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিয়ে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার রিপোর্টেও র‍্যাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়।

এর ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে যুক্তরাষ্ট্র র‍্যাব ও এর কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ ছিল, বাহিনীটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত। যদিও বাংলাদেশ সরকার সে সময় অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছিল, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস দমনে র‍্যাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার র‍্যাব বিলুপ্ত না করে বাহিনীটিকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করার উদ্যোগ নেয় বলে জানা যায়। দৃশ্যমান অভিযান কমিয়ে যৌথ অপারেশন বাড়ানো হয়। বর্তমান সরকারও একই ধরনের অবস্থান অনুসরণ করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ বিভিন্ন সময় বলেছেন, দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় একটি এলিট ফোর্সের প্রয়োজন রয়েছে। তবে সেটি বর্তমান কাঠামোয় থাকবে নাকি পুনর্গঠন হবে, সে বিষয়ে সরকার এখনো স্পষ্ট অবস্থান জানায়নি।

এদিকে গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন তাদের প্রতিবেদনে র‍্যাবকে গুমের ঘটনায় জড়িত প্রধান বাহিনী হিসেবে উল্লেখ করে বিলুপ্তির সুপারিশ করেছে। কমিশনের সুপারিশে বলা হয়, র‍্যাবে থাকা সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের নিজ নিজ বাহিনীতে ফিরিয়ে দিয়ে পুলিশের অধীনে নতুন বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করা যেতে পারে।

মানবাধিকারকর্মী ও গুম তদন্ত কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন বলেছেন, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা পুলিশের রয়েছে। তার মতে, আলাদা ‘এলিট ফোর্স’ ধারণার পরিবর্তে জবাবদিহিমূলক ও আইনভিত্তিক বিশেষ ইউনিট গঠনই বেশি কার্যকর হতে পারে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক চাপের কারণে র‍্যাবের আগের ধরনে কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে ভবিষ্যতে বাহিনীটি টিকে থাকলেও এর কাঠামো ও কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন