রয়টার্স ও ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস–এ প্রকাশিত বিবৃতিতে টিউলিপ বলেন: “এই ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’-এর রায় যতটা অনিবার্য, ততটাই অবৈধ। বিচার প্রক্রিয়া ছিল ভুয়া, নথি ছিল জাল, আর পুরো মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৮:১৭
টিউলিপ সিদ্দিক। ছবি : রয়টার্স ।
ঢাকা/লন্ডন: যুক্তরাজ্যের এমপি ও সাবেক ব্রিটিশ মন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিক–কে বাংলাদেশে একটি আলোচিত দূর্নীতি মামলায় অনুপস্থিতিতে দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই মামলায় দণ্ডিত হয়েছেন তার খালা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (৫ বছর) এবং হাসিনার বোন শেখ রেহানা (৭ বছর)। রায়ের পর পুরো দেশজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন আরও গভীর হয়েছে।
বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট, ক্ষমতার পালাবদল এবং অন্তর্বর্তী সরকারের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে অনেকেই এই রায়কে “অবাস্তব”, “নির্যাতনমূলক” এবং “রাজনৈতিক প্রতিশোধমূলক” হিসেবে বলছেন। সাধারণ জনগণ ও বিশ্লেষকদের একাংশের মতে— এটি মূলত জামায়াত-বিএনপি এবং নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকারের একটি “রাজনৈতিক নাটক”, যার লক্ষ্য পুরনো রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নির্মূল করা।
কী অভিযোগে এই সাজা?
রয়টার্সের বরাত দিয়ে বলা হয়, ঢাকার একটি কমিশন করা নতুন টাউনশিপ প্রকল্পের প্রায় ১৩,৬১০ বর্গফুট জমি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে— এমন অভিযোগই মামলার ভিত্তি।
প্রসিকিউশন বলছে:
টিউলিপ সিদ্দিক, শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন নথি অনুযায়ী বরাদ্দ ছিল বেআইনি তাতে ভূমি অফিস, মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছিল
তবে বাদীপক্ষ ও বহির্বিশ্বের বিশ্লেষকদের মতে এই অভিযোগের প্রমাণ স্বচ্ছ নয়, বরং রাজনৈতিক চরিত্রহরণ ও প্রতিশোধের অংশ।
রায়: কার কত সাজা
টিউলিপ সিদ্দিক — ২ বছর কারাদণ্ড শেখ হাসিনা — ৫ বছর কারাদণ্ড শেখ রেহানা — ৭ বছর কারাদণ্ড প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা জরিমানা, যা পরিশোধ না করলে অতিরিক্ত ৬ মাস কারাদণ্ড মামলার আরও ১৪ জন সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীকে ৫ বছর করে সাজা
রায় ঘোষণার সময় তিনজনই দেশে ছিলেন না।
যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই, ফলে টিউলিপ সিদ্দিককে দেশে ফিরিয়ে আনা কার্যত অসম্ভব।
টিউলিপ সিদ্দিক: “এটি ভুয়া, হাস্যকর ও এক প্রহসন”
রয়টার্স ও ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস–এ প্রকাশিত বিবৃতিতে তিনি বলেন:
“এই ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’-এর রায় যতটা অনিবার্য, ততটাই অবৈধ। বিচার প্রক্রিয়া ছিল ভুয়া, নথি ছিল জাল, আর পুরো মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
তিনি আরও জানান:
মামলার কোনো নোটিশ তাকে দেওয়া হয়নি আদালত তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়নি তার নামে যে বাংলাদেশি পরিচয়পত্র দেখানো হয়েছে, তা জাল
লেবার পার্টির অবস্থান: “এই বিচার অবৈধ ও অগ্রহণযোগ্য”
লন্ডন থেকে লেবার পার্টির মুখপাত্র বলেছেন:
“টিউলিপ সিদ্দিক কখনোই ন্যায়সঙ্গত আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ পাননি। অভিযোগের বিবরণও তাকে জানানো হয়নি। তাই আমরা এই রায় স্বীকৃতি দিচ্ছি না।”
কেন অনেকেই বলছেন— এটি জামায়াত-বিএনপি ও ইউনূস সরকারের ‘নাটক’?
১. ক্ষমতার পালাবদলের পর ধারাবাহিক রাজনৈতিক প্রতিশোধ
২০২৪ সালে প্রচণ্ড বিক্ষোভ ও সহিংসতার পর শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। এরপর থেকেই:
হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড দুর্নীতির মামলায় ২১ বছরের সাজা আওয়ামী লীগের বহু নেতা–কর্মীর ওপর মামলা
এগুলোকে অনেকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে দেখছেন।
২. ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ
অন্তর্বর্তী সরকারকে বলা হচ্ছে:
জামায়াত-বিএনপি–সমর্থিত পুরনো সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বকে দমন করতে বদ্ধপরিকর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিরোধীদের প্রতি সহনশীল, কিন্তু আওয়ামী লীগপন্থী নেতাদের প্রতি কঠোর
৩. বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন
আদালতগুলোর উপর প্রশাসনিক চাপ,
অভিযোগ, নথি তৈরিতে স্বচ্ছতার অভাব,
বহু আইনজীবীর হয়রানি,
এমনকি বাদীপক্ষের আইনজীবীদেরও হুমকি–ধমক—
এইসব কারণে পুরো বিচারপ্রক্রিয়া সন্দেহের মুখে।
৪. টিউলিপ সিদ্দিক আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত — তাই “সাজানো মামলা”র ধারণা আরও জোরালো
তিনি যুক্তরাজ্যের সাবেক মন্ত্রী ব্রিটিশ রাজনীতিতে প্রভাবশালী লেবার সরকারের আর্থিক ও করাপশনবিরোধী নীতির অংশ ছিলেন
এমন একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অফিসিয়াল নোটিশ ছাড়াই রায়— স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে।
আওয়ামী লীগের বক্তব্য: “রায় রাজনৈতিক নাটকের অংশ”
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বলেছে:
“এই রায় সরকারের হাতে পরিচালিত রাজনৈতিক প্রতিহিংসার উদাহরণ মাত্র। দেশের অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা ধরে রাখতে পুরনো নেতৃত্বকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে।”
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
রয়টার্স, এএপি, দ্য গার্ডিয়ান, ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস — প্রায় সব আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমই একই কথা বলছে:
বিচার যথাযথ হয়নি নথির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে রাজনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী বাংলাদেশে আইনের শাসন সংকট আরও গভীর হচ্ছে
যুক্তরাজ্যের আইনজীবী মহল এই রায়কে বলেছেন:
“কৃত্রিমভাবে সাজানো, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং আইনগতভাবে অযৌক্তিক।”
ভবিষ্যত কী?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই রায় নিঃসন্দেহে একটি বড় মোড়:
অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে পারে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত জামায়াত-বিএনপি ও অন্তর্বর্তী সরকারের উপর ‘শত্রুতামূলক রাজনীতি’ পরিচালনার অভিযোগ আরও প্রবল হবে বিচারব্যবস্থা নিয়ে জনবিশ্বাস আরও দুর্বল হতে পারে
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি মামলা নয়— বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যত গঠনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একটি বড় ঘটনা।
সূত্র: রয়টার্স, এএপি।
বায়ান্ননিউজ২৪/এডিটর ইন চীফ
প্রচ্ছদ থেকে আরো পড়ুন