ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুস
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে জারি করা এক গেজেট ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ১০ ফেব্রুয়ারি জারি করা সেই প্রজ্ঞাপনে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস নিজেকে দায়িত্ব হস্তান্তরের তারিখ থেকে এক বছরের জন্য ‘ভেরি ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট পারসন’ বা ভিভিআইপি ঘোষণা করেন।
গেজেটে উল্লেখ করা হয়, বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী আইন, ২০২১ এর ধারা ২(ক) অনুযায়ী তাকে এ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে তিনি এক বছরের জন্য স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স এসএসএফের পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা সুবিধা পাবেন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে স্বচ্ছতা নিয়ে। সরকারি গেজেট সাধারণত বাংলাদেশ গভার্নমেন্ট প্রেস এর ওয়েবসাইটে প্রকাশ ও সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট তারিখের ‘Extraordinary Gazettes’ আর্কাইভে এই প্রজ্ঞাপনটি পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে গভার্নমেন্ট প্রেসের উপ পরিচালক মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বলেন, “ওইটা মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে এসেছিল। তাদের রিকোয়ারমেন্ট অনুযায়ী ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়নি।” তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্দেশনা থাকলে কোনো গেজেট অনলাইনে প্রকাশ না করার সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়। একটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, যা একজন বিদায়ী সরকারপ্রধানকে এক বছরের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আনে, তা জনসমক্ষে প্রকাশ না করা কেন? সরকারি কার্যপ্রণালী অনুযায়ী, গেজেট প্রকাশই কোনো সিদ্ধান্তকে আনুষ্ঠানিক ও প্রামাণ্য করে তোলে। সেখানে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজ্ঞাপন গোপন রাখার সিদ্ধান্ত স্বচ্ছতার মানদণ্ড নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
আইনের ২(ক) ধারায় সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অন্য কোনো ব্যক্তিকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে ঘোষণা করতে পারে। তবে আইন অনুযায়ী বিদায়ী সরকারপ্রধানরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসএসএফ নিরাপত্তা পান না। আলাদা করে গেজেট জারি হলেই তা কার্যকর হয়। অর্থাৎ, এটি কোনো নিয়মিত বা বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া ছিল না, বরং ছিল একটি সচেতন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত।
সমালোচকরা বলছেন, ভোটের মাত্র দুই দিন আগে এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। যখন দেশের মানুষ নির্বাচনের ফলাফলের অপেক্ষায়, তখন বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টার নিজের জন্য এক বছরের বিশেষ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জনমনে প্রশ্ন তুলতেই পারে। এটি কি কেবল নিরাপত্তাজনিত প্রয়োজন, নাকি ক্ষমতার প্রভাব দীর্ঘায়িত করার একটি প্রচেষ্টা?
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই গেজেটটি জারি করেন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব মো. সাইফুল্লাহ পান্না, যিনি বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত রয়েছেন। তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।
‘রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টা এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা বিধিমালা, ২০২৫’ অনুযায়ী, ভিভিআইপি হিসেবে ঘোষিত ব্যক্তির বাসভবন, কর্মস্থল, অনুষ্ঠানস্থল ও দেশ বিদেশে ভ্রমণের সময় বিস্তৃত নিরাপত্তা বলয় থাকে। এসএসএফ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা লোকজনের ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই থেকে শুরু করে প্রবেশ ও প্রস্থান নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত সবকিছু তদারকি করে।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়া ইউনূস প্রায় ১৮ মাস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা ত্যাগ করেন। কিন্তু দায়িত্ব ছাড়ার আগে নেওয়া এই গোপন সিদ্ধান্ত এখন তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে নতুন করে বিতর্কের মুখে ফেলেছে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা কেবল আইনি প্রক্রিয়া নয়, এটি নৈতিক অঙ্গীকারও। ভোটের প্রাক্কালে নিজের জন্য বিশেষ মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তা প্রকাশ্যে না আনা জনমনে আস্থার ঘাটতি তৈরি করতেই পারে। এখন প্রশ্ন, এই সিদ্ধান্তের পূর্ণ ব্যাখ্যা কি জাতির সামনে আসবে, নাকি গেজেটের মতোই সেটিও আড়ালেই থেকে যাবে।
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন