প্রচ্ছদ

টিউলিপের বিচার প্রক্রিয়া “অন্যায্য ও সাজানো বিচার” -ব্রিটিশ আইনজীবীদের নিন্দা

ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের প্রতি বিচার প্রক্রিয়ার অসঙ্গতি ও অস্বচ্ছতা নিয়ে যুক্তরাজ্যের পাঁচজন শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী তীব্র সমালোচনা করেছেন

প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৫ ০৪:০৯

টিউলিপ সিদ্দিক

বাংলাদেশের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের প্লট বরাদ্দ মামলার রায় ঘোষণার আগে ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের প্রতি বিচার প্রক্রিয়ার অসঙ্গতি ও অস্বচ্ছতা নিয়ে যুক্তরাজ্যের পাঁচজন শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী তীব্র সমালোচনা করেছেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে লেখা তাদের চিঠিতে বলা হয়েছে, টিউলিপ সিদ্দিককে ন্যূনতম আইনি অধিকার—অভিযোগ জানা, প্রমাণ দেখা কিংবা আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ—কোনোটিই দেওয়া হয়নি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান প্রকাশিত প্রতিবেদনে চিঠিটিকে ‘অন্যায্য ও সাজানো বিচার প্রক্রিয়ার স্পষ্ট উদাহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। চিঠিতে স্বাক্ষরকারী আইনজীবীদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাজ্যের সাবেক বিচারমন্ত্রী রবার্ট বাকল্যান্ড, সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের স্ত্রী শেরি ব্লেয়ার, ডমিনিক গ্রিভ, ফিলিপ স্যান্ডস এবং জিওফ্রি রবার্টসনের মতো আন্তর্জাতিকভাবে স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব।

বাংলাদেশে চলমান মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, টিউলিপ তার খালা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘প্রভাবিত’ করে পূর্বাচলে তার মায়ের জন্য একটি প্লট বরাদ্দ করিয়েছিলেন। দুদকের করা মামলায় হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা এবং রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিককে ‘পলাতক’ দেখিয়ে বিচার চলছে—যার ফলে তাদের পক্ষ থেকে কোনও আইনজীবী আদালতে লড়াই করার সুযোগই পাননি। ১ ডিসেম্বর রায় ঘোষণার দিন ঠিক করা হয়েছে, এবং দুদক তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি—যাবজ্জীবন কারাদণ্ড—চেয়েছে। যদিও টিউলিপ বরাবরই অভিযোগগুলোকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে অস্বীকার করে এসেছেন।

তবে শুধু আইনি প্রক্রিয়া নয়, টিউলিপের আইনজীবী নিয়োগের ক্ষেত্রেও গুরুতর অসঙ্গতির অভিযোগ তুলে ধরেছেন ব্রিটিশ আইনজীবীরা। তাদের দাবি—বাংলাদেশে যাকে টিউলিপ আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দিতে চেয়েছিলেন, তাকে ‘সরে দাঁড়াতে বাধ্য করা হয়েছে’, এমনকি তাকে গৃহবন্দিও করা হয়েছে এবং তার মেয়ের বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, এতে স্পষ্ট হয় যে বিচার প্রক্রিয়া স্বাধীন নয় এবং তা ভয়ভীতি ও রাজনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। তারা লিখেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ ও ভয়ভীতির অভিযোগকে এই ঘটনা আরও দৃঢ় করে।

আইনজীবীরা প্রশ্ন তুলেছেন, যখন টিউলিপ সিদ্দিক যুক্তরাজ্যের সংসদ সদস্য হিসেবে লন্ডনে আছেন, তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়, এবং প্রয়োজনে তাকে যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী প্রত্যর্পণ করে বাংলাদেশে আনা সম্ভব—তখন কেন তাকে ‘পলাতক’ দেখিয়ে অনুপস্থিতিতেই রায় দেওয়া হচ্ছে? তাদের মতে, অভিযোগ থাকলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে, প্রমাণ দেখিয়ে, তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার কথা। কিন্তু এই মামলায় টিউলিপকে কোনও কাগজপত্র দেখানো হয়নি, আইনজীবী দেওয়া হয়নি, শুনানিতে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়নি—যা ন্যায়বিচারের ন্যূনতম শর্তও পূরণ করে না।

এদিকে টিউলিপের ঘনিষ্ঠজনরা বলছেন, এটি “স্পষ্টভাবে ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মামলা”, যার লক্ষ্য শুধু টিউলিপকেই নয়, বরং শেখ হাসিনার পরিবার ও বাংলাদেশি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাদের প্রভাবকে দুর্বল করা। এমনকি তারা জানিয়েছেন—বাংলাদেশের নতুন ক্ষমতাসীন মহল, যারা আইনশাসনের কথা বলছেন, তাদের অধীনেই এমন অন্যায্য বিচার চলছে—যা নৈতিকভাবে অত্যন্ত লজ্জাজনক।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, এই মামলার বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তারা নিয়মিত গণমাধ্যমে টিউলিপকে নিয়ে মন্তব্য করছেন—যা বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে যায়। যখন প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা অভিযোগের রায় ঘোষণার আগে মিডিয়ায় আসামিকে অপরাধী হিসেবে তুলে ধরেন, তখন সেই বিচার কতটা ন্যায্য হতে পারে—এ প্রশ্নও তুলেছেন আইনজীবীরা।

সবশেষে, ব্রিটিশ আইনজীবীরা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন—ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই এই ‘একতরফা’, ‘অংশগ্রহণ-বিহীন’ বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে, এবং টিউলিপ সিদ্দিককে তার আইনগত অধিকার—অভিযোগ জানা, প্রমাণ দেখা, আইনজীবী নিয়োগ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের—পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে। তারা মনে করেন, এই মামলাটি শুধু টিউলিপ নয়—বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

বায়ান্ননিউজ২৪/এডিটর ইন চীফ

প্রচ্ছদ থেকে আরো পড়ুন