গত ছয় মাসে অন্তত কয়েকটি জেলায় মাদ্রাসায় শিক্ষক কর্তৃক যৌন নির্যাতনের ২০৫টি বিচ্ছিন্ন ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে।যার মধ্যে সিলেট, কুমিল্লা, কুষ্টিয়া, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও ফেনীতে কয়েকটি মামলা হয়েছে।
প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫ ০৫:৪৮
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে নূরে মদিনা মাদ্রাসা
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে নূরে মদিনা মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক শরীফুল ইসলাম ইব্রাহীম (৩২)-এর বিরুদ্ধে পরপর পাঁচ ছাত্রকে বলাৎকার করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি জানাজানি হতেই স্থানীয় লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে আটক করে জুতার মালা পরিয়ে শাস্তি দেন। পরে স্থানীয় চার মাতব্বরের নেতৃত্বে বসানো সালিশে বিষয়টি ৪ লাখ টাকায় ‘মীমাংসা’ করা হয়—যার মধ্যে ভুক্তভোগী চার পরিবারের ভাগে গেছে মাত্র ১ লাখ টাকা। বাকিটা বিচারকার্যে জড়িত কয়েকজন ব্যক্তি ভাগ করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের নাম ও পরিচয় শিশু সুরক্ষা আইনের কারণে গোপন রাখা হলো।
আগে ছিল ১০ লাখ জরিমানা, পরে কমে ৪ লাখে
ঘটনার সূত্রপাত দুই মাস ধরে। অভিযোগ অনুযায়ী, শরীফুল তার নিজ কক্ষে একে একে পাঁচ ছাত্রকে ডেকে নিয়ে বলাৎকার করেন। এক পর্যায়ে একজন ছাত্র অসুস্থ হয়ে পড়লে ঘটনাটি ফাঁস হয়ে যায়।
১১ নভেম্বর সন্ধ্যায় এলাকার কয়েকজন মাতব্বর—ফরিদ মাস্টার, দেলোয়ার, কৃষকদলের সাবেক নেতা এবং দলিল লেখক জালাল—মিলে একটি সালিশ বসান। প্রথমে ১০ লাখ টাকা জরিমানা ধার্য করা হলেও পরে সেটি কমিয়ে ৪ লাখ টাকায় আনা হয়। শরীফুলের বাবা সামসুল হক তালুকদার—মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক—জরিমানার টাকাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সালিশ পরিচালনাকারীদের হাতে তুলে দেন।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি—চার পরিবার মাত্র ২৫ হাজার করে পেয়েছে, আরেক পরিবার কোনো অর্থই পায়নি। তাছাড়া সালিশের নামে যে অর্থ নেওয়া হয়েছে তার বড় অংশই স্থানীয় ওই মাতব্বরদের মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে।
একই শিক্ষক ২০২০ সালেও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন
জানা গেছে, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে শরীফুল ইসলাম আরও দুই ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। জামিনে বের হয়ে আবারও একই অভিযোগে জড়ালেন তিনি।
এলাকাবাসীর অভিযোগ—ঘটনার পরও তিনি এলাকায় স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছেন, এবং মাদ্রাসাটিও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
মাতব্বরদের স্বীকারোক্তি—‘মীমাংসাই ভালো’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মামলার আসামি ফরিদ মাস্টার বায়ান্ননিউজকে বলেন—
“থানা থেকে আমাদের বলা হয়েছিল, বাচ্চারা থানায় বা কোর্টে গেলে সমস্যা হবে, তাই সামাজিকভাবে মীমাংসা করতে। আমরা চার লাখ টাকায় নিষ্পত্তি করি। ভিকটিমদের টাকাও দেওয়া হয়েছে।”
অপর মাতব্বর দেলোয়ার বলেন—
“ঘটনাটি আমি দুই-তিন মিনিট দেখেছি। পরে চলে যাই। টাকার বিষয়ে আমি বেশি কিছু জানি না। শুনেছি বিএনপির জাকির নামের একজন, কিছু সাংবাদিক ও ভিকটিম পরিবার—এরা পেয়েছে।”
ভুক্তভোগীরা বলছে—একজন ছাত্র এখনো অসুস্থ
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, একজন ছাত্র এখনো চিকিৎসাধীন এবং পড়ালেখা বন্ধ রয়েছে।
পুলিশ বলছে—অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা হবে
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি শাহীনুর আলম বলেন—
“ঘটনা সম্পর্কে আমাদের কাছে কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। পুলিশ কখনো কাউকে মামলা করতে নিরুৎসাহিত করে না। অভিযোগ এলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
গত ছয় মাসে মাদ্রাসায় কতটি বলাৎকারের ঘটনা?
সরকারি বা সমন্বিত কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে গত ছয় মাসে অন্তত কয়েকটি জেলায় মাদ্রাসায় শিক্ষক কর্তৃক যৌন নির্যাতনের ২০৫টি বিচ্ছিন্ন ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে।যার মধ্যে সিলেট, কুমিল্লা, কুষ্টিয়া, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও ফেনীতে কয়েকটি মামলা হয়েছে।
শিশু অধিকার সংগঠনগুলোর দাবি—এ ধরনের ঘটনা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চাপ, লজ্জা অথবা স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কারণে প্রকাশ পায় না। ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়াই স্বাভাবিক।
প্রচ্ছদ থেকে আরো পড়ুন