বাংলাদেশ

দেশের বিদ্যুৎ খাতে ভয়াবহ সংকট

সরকারের নীতিগত ব্যর্থতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমছে, বাড়ছে লোডশেডিং

প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৪:০২

লোডশেডিংয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ। ছবি: প্রতীকি

দেশে বিদ্যুৎ সংকট দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। বর্তমান সময়ে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা যেখানে প্রায় ১৪,৫০০ থেকে ১৪,৮০০ মেগাওয়াট, সেখানে উৎপাদন হচ্ছে গড়ে ১৩,৫০০ থেকে ১৩,৯০০ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১,২০০ মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা মেটাতে দেশজুড়ে ব্যাপক লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে।

এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে জনজীবনে। রাজধানীর বাইরে অধিকাংশ জেলায় দিনে ৮-৯ ঘণ্টা, অনেক এলাকায় ১০-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও খারাপ—কোথাও দিনে অর্ধেক সময়ও বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না।

তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সংকটের মূল কারণ শুধু জ্বালানি ঘাটতি নয়। দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও বাস্তবে এর বড় অংশই ব্যবহার করা যাচ্ছে না। গ্যাস, কয়লা ও তেল সংকটের পাশাপাশি আর্থিক ও নীতিগত সমস্যাও উৎপাদন কমে যাওয়ার বড় কারণ।

বিশেষ করে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা বকেয়া পড়ে আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় অনেক কোম্পানি লোকসানের মুখে পড়েছে। ফলে তারা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বা সীমিতভাবে কেন্দ্র চালাচ্ছে।

গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যেও সংকট প্রকট। প্রায় ৭,৮০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এই খাতে বাস্তবে উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ২,৯০০ মেগাওয়াটে। তীব্র গ্যাস সংকটে একাধিক কেন্দ্র বন্ধ বা আংশিক চালু রয়েছে। একইভাবে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর প্রায় ৫,৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র আড়াই হাজার মেগাওয়াটের মতো।

কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর অবস্থাও স্থিতিশীল নয়। উচ্চমূল্য ও আমদানি জটিলতার কারণে অনেক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে সামগ্রিকভাবে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমে যাচ্ছে।

খাত সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ খাতে নীতিগত অস্থিরতা, মামলা-মোকদ্দমা, প্রশাসনিক হয়রানি এবং বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে গেছে এবং উৎপাদন ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে—সরকার বকেয়া পরিশোধ করতে পারছে না, উৎপাদকরা উৎপাদন কমাচ্ছে, আর উৎপাদন কমে যাওয়ায় লোডশেডিং বাড়ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ, শিল্পখাত এবং ব্যবসা-বাণিজ্য—সবখানেই চাপ বাড়ছে।

সব মিলিয়ে, বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকট শুধু জ্বালানি নয়; বরং নীতি, অর্থনীতি এবং ব্যবস্থাপনার সমন্বয়হীনতার ফল। দ্রুত বকেয়া পরিশোধ, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং উৎপাদন বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন