নিভৃতচারী এক কিংবদন্তির বিদায়
প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৩:১৭
আবুল বশর মোহাম্মদ ছদরুল উলা চৌধুরী
সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান, ভাষা সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও বিশিষ্ট সমাজসেবক আবুল বশর মোহাম্মদ ছদরুল উলা চৌধুরী (বশর মিয়া)-এর দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বাদ যোহর স্থানীয় কানিশাইল দিঘীরপার ঈদগাহ মাঠে তার জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, সমাজসেবক, বিভিন্ন পেশাজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে। জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। পুরো এলাকা জুড়ে নেমে আসে শোকের আবহ।
এর আগে বুধবার সন্ধ্যায় সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে, এক মেয়ে এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
১৯৩৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া বশর মিয়ার জীবন শুরু এবং শেষ—দুটোই একই মাটিতে, কানিশাইল গ্রামে। পিতা মাহমুদ বখত চৌধুরী ও মাতা ফয়জুন্নেছা চৌধুরীর আদর্শে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি সারাজীবন শিকড়ের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন।
দত্তরাইল এমই স্কুল (বর্তমান ঢাকাদক্ষিণ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ) থেকে শুরু করে সিলেট পাইলট হাইস্কুল এবং এমসি কলেজ—সবখানেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও নেতৃত্বগুণে উজ্জ্বল। ১৯৫২ সালে উচ্চ মাধ্যমিক শেষে ভর্তি হন ঢাকার আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমান বুয়েট)।
কিন্তু রাজনৈতিক অবস্থান ও আপসহীন মনোভাবের কারণে তার ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা অসমাপ্ত থেকে যায়। এই অপূর্ণতা তাকে থামিয়ে দিতে পারেনি, বরং মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তার সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন দেশের পরবর্তীকালের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব— সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিন, সাবেক শিক্ষা সচিব হেদায়েত আহমদ, শাবিপ্রবির সাবেক উপাচার্য ড. ছদরুদ্দিন চৌধুরী,, ইটিভি চেয়ারম্যান আবু সাইদ আহমদ, এবং প্রাক্তন আমলা গোলাম আকবরসহ আরও অনেকে।
তাদের অনেকেই জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও বশর মিয়া নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছেন মানুষের সেবায়।
তিনি ছিলেন একজন ভাষা সৈনিক এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন।
গোলাপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন ছাড়াও তিনি ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং দীর্ঘদিন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
গ্রামে ফিরে তিনি শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। ভাদেশ্বর নাসির উদ্দিন হাইস্কুল ও ঢাকাদক্ষিণ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।
তিনি ঢাকাদক্ষিণ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের সভাপতি এবং ঢাকাদক্ষিণ ডিগ্রি কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
নিজ এলাকার শিক্ষা বিস্তার ও সামাজিক উন্নয়নে তার অবদান আজও স্মরণীয়।
সহপাঠীরা যখন জাতীয় পর্যায়ের নেতা হয়েছেন, তখন বশর মিয়া থেকেছেন সাধারণ মানুষের মাঝে। তিনি কখনো ব্যক্তিগত প্রাপ্তি বা স্বীকৃতির পেছনে ছুটেননি।
তার জীবনের দর্শন ছিল সহজ—মানুষের পাশে থাকা।
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন