রয়টার্সের প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১৮:১৪
ছবি: রয়টার্স
দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের নির্বাসিত জীবন শেষে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের পথে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে তিনি দেশের শাসনভার গ্রহণের একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছেন।
রয়টার্স জানায়, লন্ডনে প্রায় বিশ বছর নির্বাসনে থাকার পর দেশে ফেরার মাত্র দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে ৬০ বছর বয়সী এই নেতার সামনে। এমনটি হলে তিনি এমন একটি দেশের নেতৃত্ব দেবেন, যেটি একসময় শাসন করেছিলেন তার বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন মতামত জরিপ সঠিক প্রমাণিত হলে বৃহস্পতিবারের নির্বাচন হবে তারেক রহমানের জন্য এক ঐতিহাসিক ও নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের মঞ্চ। ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার হয়ে কারামুক্তির পর চিকিৎসার জন্য দেশ ছাড়েন তিনি। এরপর দীর্ঘ সময় নির্বাসনেই কাটে তার রাজনৈতিক জীবন।
গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফেরেন, যেখানে তাকে ঘিরে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও উচ্ছ্বাস দেখা যায়। এর কয়েক মাস আগেই ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বর্তমানে তিনি ভারতের নয়াদিল্লিতে অবস্থান করছেন বলে রয়টার্স উল্লেখ করেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে একসময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুই পরিবারের দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলেছে। তারেক রহমানের বাবা জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত দেশ শাসন করেন এবং পরে এক হত্যাকাণ্ডে নিহত হন।
নীতিগত অবস্থান প্রসঙ্গে রয়টার্স জানায়, তারেক রহমান বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নতুনভাবে সাজানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যাতে বিনিয়োগ বাড়ে এবং দেশ কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে। এটি শেখ হাসিনার নীতির সঙ্গে ভিন্ন, যাকে অনেক বিশ্লেষক দিল্লিকেন্দ্রিক বলে মনে করতেন।
অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তিনি দরিদ্র পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর কথা বলেছেন। পাশাপাশি তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে খেলনা ও চামড়াজাত পণ্যের মতো খাত বিকাশের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেছেন। স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা রোধে প্রধানমন্ত্রীদের জন্য সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ বা ১০ বছরের সীমা নির্ধারণের প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি।
রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, ঢাকায় স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে ফেরার পর থেকে ঘটনাপ্রবাহ এত দ্রুত এগিয়েছে যে সময় কীভাবে কেটেছে, তা নিজেও বুঝে উঠতে পারেননি। তার ভাষায়, বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখার পর থেকে প্রতিটি মিনিট কীভাবে কেটেছে, আমি নিজেও জানি না।
১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করা তারেক রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পড়াশোনা শুরু করলেও তা শেষ করেননি। পরে তিনি বস্ত্র ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশে ফেরার পর তারেক রহমান নিজেকে এমন একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছেন, যিনি অতীতের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নির্যাতনের বাইরে তাকাতে প্রস্তুত। ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের সময় তার প্রভাব নিয়ে নানা অভিযোগ থাকলেও তিনি বরাবরই নেপথ্য ক্ষমতার কেন্দ্র পরিচালনার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
প্রতিশোধের রাজনীতি প্রসঙ্গে রয়টার্সকে তিনি বলেন, প্রতিশোধে কোনো কল্যাণ আসে না। প্রতিশোধ মানুষকে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য করে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শান্তি ও স্থিতিশীলতা।
শেখ হাসিনার শাসনামলে একাধিক দুর্নীতি মামলায় অনুপস্থিত অবস্থায় দণ্ডিত হন তারেক রহমান। ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা মামলায় ২০১৮ সালে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি সব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন। হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর এসব মামলায় তিনি খালাস পান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
রয়টার্স বলছে, দেশে ফেরার পর তারেক রহমান সংযত ও শান্ত অবস্থান নিয়েছেন। উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য এড়িয়ে তিনি সংলাপ, সংযম ও পুনর্মিলনের আহ্বান জানাচ্ছেন। রাষ্ট্রের ওপর জনগণের মালিকানা ফিরিয়ে আনা এবং প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে।
প্রতিবেদনের একাংশে তার ব্যক্তিগত জীবনের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। পরিবারের পোষা সাইবেরিয়ান বিড়াল জেবু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তার মেয়ে জাইমা রয়টার্সকে জানান, জেবুর বয়স সাত বছর এবং তারা সেটিকে দত্তক নিয়েছেন।
দলীয় সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানায়, বিএনপির ভেতরে তারেক রহমানের নিয়ন্ত্রণ এখন দৃঢ়। তিনি সরাসরি প্রার্থী নির্বাচন ও জোট আলোচনা তদারকি করছেন, যা আগে বিদেশ থেকেই করতেন।
সবশেষে রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও তা টিকিয়ে রাখাই হবে তার সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। গণতন্ত্র ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয় এবং গণতন্ত্রের মাধ্যমেই জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, আমরা গণতন্ত্র চর্চা করতে চাই এবং দেশকে নতুন করে গড়তে চাই।
রাজনীতি থেকে আরো পড়ুন