সম্পাদকীয়

মহানায়কের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারী ২০২৬ ০৪:৫১

শোভাযাত্রার ট্রাকে বঙ্গবন্ধু, ছবি: সংগৃহীত ।

বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটি কেবল একটি ভৌগোলিক সীমানা নয়। এটি একটি রাজনৈতিক দর্শন, একটি সংগ্রামের ফসল, একটি আত্মত্যাগের দলিল। এই রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে যাঁর নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ১০ জানুয়ারি কেবল আবেগঘন একটি দিন নয়, এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় যাত্রার প্রকৃত সূচনাবিন্দু।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও সেই স্বাধীনতা ছিল অসম্পূর্ণ। কারণ জাতির পিতা তখনও পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণা, রাজনৈতিক ও নৈতিক নেতৃত্বের প্রতীক তখন মৃত্যুর মুখোমুখি। তাই বিজয়ের আনন্দের মধ্যেও জাতির মনে ছিল গভীর উৎকণ্ঠা। বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন কি না, সেটিই ছিল সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

এই অনিশ্চয়তার অবসান ঘটে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২। পাকিস্তানের কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু যখন স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন, তখনই বিজয়ের অর্থ সম্পূর্ণ হয়। ইতিহাসে খুব কম জাতির ভাগ্যে এমন একটি মুহূর্ত আসে, যেখানে স্বাধীনতা ও নেতৃত্ব একই সঙ্গে ফিরে আসে।

বঙ্গবন্ধুর কারাবাস ছিল কেবল একজন রাজনীতিকের বন্দিত্ব নয়। এটি ছিল একটি জাতির কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা জানত, বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে বাংলাদেশকে আর দমিয়ে রাখা যাবে না। তাই তাঁকে হত্যা করার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছিল। তাঁর সেলের পাশে কবর খোঁড়া হয়েছিল। ফাঁসির আদেশ ছিল প্রস্তুত। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা লিখেছিল।

আন্তর্জাতিক জনমত, বিশেষ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর দৃঢ় অবস্থান, পাকিস্তানের সেই ষড়যন্ত্র ভেস্তে দেয়। বঙ্গবন্ধুর মুক্তি তখন কেবল মানবিক প্রশ্ন নয়, এটি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে পরিণত হয়। ফলে পাকিস্তান বাধ্য হয় তাঁকে মুক্তি দিতে।

লন্ডন ও দিল্লিতে বঙ্গবন্ধু যে অভ্যর্থনা পান, তা ছিল একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রতি বিশ্বজনতার স্বীকৃতি। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের আচরণ ইতিহাসে বিরল। একজন সদ্য স্বাধীন দেশের নেতা, যিনি তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতায় আসেননি, তাঁকে দেওয়া হয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান। এটি প্রমাণ করে, বঙ্গবন্ধু তখনই বিশ্ব রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী নৈতিক অবস্থান তৈরি করেছিলেন।

১০ জানুয়ারি ঢাকার চিত্র ছিল অভূতপূর্ব। তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত মানুষের ঢল ছিল ইতিহাসের এক অনন্য দৃশ্য। মানুষ কাঁদছিল, হাসছিল, স্লোগানে আকাশ কাঁপাচ্ছিল। এটি ছিল দীর্ঘ বঞ্চনা, ভয় ও অনিশ্চয়তার অবসানের মুহূর্ত।

রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ছিল একটি সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য রূপরেখা। মাত্র কয়েক মিনিটের সেই ভাষণে তিনি যা বলেছেন, তা আজও বাংলাদেশের সংবিধান ও রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। তিনি স্পষ্ট করে দেন, স্বাধীনতা মানে কেবল পতাকা নয়। স্বাধীনতা মানে মানুষের ভাত, কাপড়, কাজ, সম্মান ও নিরাপত্তা।

তিনি ঘোষণা দেন সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা। এটি ছিল সাম্প্রদায়িকতা, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অঙ্গীকারের পাশাপাশি তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করেন। আইনের শাসনের কথা বলেন। জনগণকে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার নির্দেশ দেন।

এই ভাষণে বঙ্গবন্ধু ছিলেন একদিকে আবেগপ্রবণ পিতা, অন্যদিকে দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক। তিনি কেঁদেছেন, আবার কঠোর নির্দেশও দিয়েছেন। তিনি কবিতার উদ্ধৃতি দিয়েছেন, আবার প্রশাসনিক দায়িত্বের কথাও বলেছেন। এই ভারসাম্যই বঙ্গবন্ধুকে অনন্য করেছে।

কিন্তু ইতিহাসের পরিহাস হলো, যাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছে, তাঁর নাম ও আদর্শ মুছে ফেলার চেষ্টা স্বাধীনতার পর থেকেই শুরু হয়েছে। একের পর এক ষড়যন্ত্র, ইতিহাস বিকৃতি, রাষ্ট্রীয় নীতিতে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির পুনর্বাসন সবই ঘটেছে এই দেশে।

সাম্প্রতিক সময় এই বিশ্বাসঘাতকতার মাত্রা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন সরকার এবং তাদের মদদপুষ্ট ছাত্র সন্ত্রাসী ও মৌলবাদী গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর উপর আঘাত হেনেছে। এটি আর রাজনৈতিক মতভেদের বিষয় নয়। এটি সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠ্যবই থেকে বিকৃত করা হয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভ, ভাস্কর্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শন ধ্বংস করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়ি, যা বাঙালির ইতিহাসের পবিত্র স্মারক, সেটিতে বারবার হামলা চালানো হয়েছে, আগুন দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল একটি বাড়ি ভাঙা নয়। এটি জাতির স্মৃতি, আত্মপরিচয় ও অস্তিত্বে আঘাত।

যারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলতে চায়, তারা জানে ইতিহাস বেঁচে থাকলে তাদের রাজনীতি টিকবে না। যারা বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলতে চায়, তারা জানে বঙ্গবন্ধু মানেই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার। তাই এই আঘাত পরিকল্পিত, সংগঠিত ও ভয়ংকর।

এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা এই দেশের মানুষ কখনও ক্ষমা করবে না। ইতিহাসের বিচার কখনও ত্বরিত হয় না, কিন্তু তা অনিবার্য। বাংলার মাটিতে একদিন এই অনাচার, ইতিহাস বিকৃতি ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার বিচার হবেই। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার বিচার যেমন হয়েছে, তেমনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের বিচারও একদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াবে।

১০ জানুয়ারি আমাদের শুধু অতীত স্মরণ করার দিন নয়। এটি আমাদের দায়িত্ব স্মরণ করার দিন। বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসা মানে কেবল ফুল প্রথাগত আনুষ্ঠিকতা পালন নয়। বঙ্গবন্ধুকে ধারণ করা মানে তার আদর্শ ধারণ করা, লালন করা, তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠন করা। 

ইতিহাস যারা মুছে ফেলতে চায়, ইতিহাস একদিন তাদেরই মুছে ফেলে। বঙ্গবন্ধু সেই ইতিহাস, যাকে মুছে ফেলা যায় না। আজ যারা মুক্তিযুদ্ধকে হেয় প্রতিপন্ন করছে, বঙ্গবন্ধুর অবদানকে অস্বীকার করে তার স্মৃতি ধ্বংস করছে , একদিন তারা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপিত হবে।

লেখক: গোলাম রসুল খান, এডিটর ইন চীফ, বায়ান্ননিউজ২৪।

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন