আজ মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তস্নাত পথ বেয়ে যে ইতিহাস রচিত হয়েছিল, তা কেবল একটি ভাষার স্বীকৃতির সংগ্রাম নয়, বরং একটি জাতির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সূচনা। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ নাম না জানা শহীদদের আত্মত্যাগ বাঙালির জাতীয় চেতনার ভিত গড়ে দিয়েছিল।
পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার সিদ্ধান্ত ছিল রাজনৈতিক আধিপত্যের বহিঃপ্রকাশ। পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষাকে অস্বীকার করে রাষ্ট্রীয় কাঠামো চাপিয়ে দেওয়ার সেই প্রয়াসের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ গড়ে ওঠে, তারই বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্রদের রাজপথে নামা এবং পুলিশের গুলিতে প্রাণহানি ছিল কেবল একটি দিনের ঘটনা নয়, তা ছিল দীর্ঘ বঞ্চনা ও অসমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চূড়ান্ত প্রকাশ।
ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য এখানেই যে, এটি বাঙালির রাজনৈতিক সচেতনতার ভিত রচনা করে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের বিজয়, ১৯৫৬ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি, এবং পরবর্তী সময়ে ছয় দফা আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—সবকিছুর বীজ নিহিত ছিল একুশের সেই আত্মত্যাগে। ভাষা আন্দোলন প্রমাণ করে, সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষার সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক মুক্তির পথও সুগম করে।
একুশের আরেকটি তাৎপর্য আন্তর্জাতিক পরিসরে। বিশ্বের ইতিহাসে মাতৃভাষার জন্য প্রাণদানের এমন নজির বিরল। সেই কারণেই ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। আজ বিশ্বব্যাপী ভাষাগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকারে দিনটি পালিত হয়।
তবে একুশ কেবল স্মৃতিচারণের দিন নয়, এটি আত্মসমালোচনারও দিন। ভাষার জন্য জীবন দেওয়া জাতি হিসেবে আমাদের দায়িত্ব বাংলা ভাষার চর্চা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা। প্রশাসন, শিক্ষা, বিচার ও প্রযুক্তিতে বাংলা ব্যবহারের বাস্তবতা কতটা সুদৃঢ় হয়েছে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। ভাষার প্রতি আবেগ থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োগে এখনও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
আজ যখন বিশ্বায়নের প্রবল স্রোতে ভাষাগত বৈচিত্র্য সংকুচিত হচ্ছে, তখন একুশ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা ছাড়া টেকসই জাতিসত্তা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, ভাষার অধিকার মানে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা নয়; এ দেশের সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষাও সমান মর্যাদার দাবিদার।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশের ভিত্তি ছিল ভাষা আন্দোলন। একুশ আমাদের শিখিয়েছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হলে ঐক্য, সাহস ও আত্মত্যাগের বিকল্প নেই। তাই একুশ কেবল ইতিহাস নয়, এটি চলমান দায়িত্ব। শহীদদের রক্তের ঋণ শোধের একমাত্র উপায়—গণতন্ত্র, ন্যায় ও সমতার ভিত্তিতে এমন এক রাষ্ট্র গড়া, যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবিক মর্যাদা সুরক্ষিত থাকবে।
অমর একুশ আমাদের প্রেরণা, আমাদের আত্মপরিচয়, আমাদের প্রতিজ্ঞা।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন