সম্পাদকীয়

ছয় দফা: বাঙালির আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার ভিত্তিপ্রস্তর

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ ১৩:৩৪

ঢাকার রাস্তায় ৬ দফা আন্দোলন।

আজ ৭ জুন, ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস। বাঙালির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ইতিহাসে এ দিনটির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। ১৯৬৬ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ছয় দফা দাবির পক্ষে দেশজুড়ে যে গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তা পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত্তি রচনা করে।

ছয় দফাকে অনেকেই বাঙালির “মুক্তির সনদ” হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কারণ, এটি ছিল তৎকালীন পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার বৈষম্য, অর্থনৈতিক শোষণ ও রাজনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার মানুষের সুস্পষ্ট দাবি। ছয় দফার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা সীমিত করে প্রদেশগুলোর স্বায়ত্তশাসন, পৃথক আর্থিক কাঠামো, রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা এবং পূর্ব বাংলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব বাংলার জনগণ বৈষম্যের শিকার হতে থাকে। জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক ক্ষমতা, প্রশাসন, সামরিক বাহিনী ও অর্থনৈতিক সম্পদের বণ্টনে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রাধান্য ছিল স্পষ্ট। এই বাস্তবতায় বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা ছিল বাঙালির ন্যায্য অধিকার আদায়ের একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক কর্মসূচি।

১৯৬৬ সালের ৭ জুন ছয় দফার দাবিতে হরতাল ও গণআন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে বহু মানুষ প্রাণ হারান। শ্রমিক মনু মিয়াসহ কয়েকজন শহীদের আত্মত্যাগ আন্দোলনকে আরও বেগবান করে। এরপর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ছয় দফার রাজনৈতিক দর্শন স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের পথ প্রশস্ত করে।

ইতিহাসবিদদের মতে, ছয় দফা ছিল মূলত একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের রূপরেখা। তবে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে, পাকিস্তানের বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে এই দাবিগুলোর বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল না। ফলে ছয় দফার ভেতরেই স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ নিহিত ছিল।

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও ছয় দফার শিক্ষা আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক। কারণ এটি শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না; এটি ছিল জনগণের অধিকার, গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা এবং ন্যায্যতার প্রশ্নে একটি ঐতিহাসিক অবস্থান। বর্তমান প্রজন্মের কাছে ছয় দফার ইতিহাস তুলে ধরা প্রয়োজন, যাতে তারা বুঝতে পারে স্বাধীনতা কোনো আকস্মিক অর্জন নয়; এটি দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও আত্মদানের ফসল।

ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবসে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, স্মরণ করি ছয় দফা আন্দোলনের শহীদদের এবং স্বাধীনতার জন্য আত্মোৎসর্গকারী লাখো মানুষকে। ইতিহাসের এই অধ্যায় নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকার অনুপ্রেরণা জোগাক।

গোলাম রসুল খান, এডিটর ইন চীফ, বায়ান্ন নিউজ ।

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন