প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৫ ২০:৩১
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী।
গোলাম রসুল খান: আজ ২১ নভেম্বর, জাতীয় সশস্ত্র বাহিনী দিবস, বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য দিন, এক অর্থবহ মুহূর্ত, এক গভীর স্মৃতিবাহী সাংগঠনিক সত্য। এই দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, শুধু একটি বার্ষিক উদযাপন নয়, বরং একটি জাতির পুনর্জন্মের দলিল, একটি ভূখণ্ডের অস্তিত্বরক্ষার শপথ, একটি জাতির চেতনার অগ্নিস্মৃতি। এই দিনটিতে আমরা স্মরণ করি মুক্তিযুদ্ধের সেই অগ্নিঝরা সময়কে, যে সময়ের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামো গঠিত হয়েছে। ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর বাঙালি সশস্ত্র প্রতিরোধ শক্তির আনুষ্ঠানিক রূপায়ন ঘটে এবং মিত্রবাহিনীর সাথে সমন্বিতভাবে মুক্তিযুদ্ধ আরও প্রবল গতি পায়। এই দিনটি তাই বাঙালির অস্তিত্ব, সম্মান, আত্মসম্মান, সাহস ও দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙালি জাতি যে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, সেই প্রতিরোধই পরিণত হয়েছিল স্বাধীনতার অগ্নিশিখায়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বই ছিল এই জাতিকে মুক্তিযুদ্ধমুখী হওয়ার মূল অনুপ্রেরণা। তিনি ছিলেন বাঙালির স্বাধীনতার নায়ক, মুক্তিযুদ্ধের স্থপতি, বাঙালির জাতিসত্তার স্থিরচিহ্ন। তাঁর ডাকেই তৈরি হয়েছিল ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, জেলো, মজুর, তরুণ, বৃদ্ধ, নারী, যুবকের সমন্বয়ে এক লৌহকঠিন প্রতিরোধ। তাঁর অনুপ্রেরণায় গড়ে ওঠে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী, যা পরবর্তীতে স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রধান প্রতিরক্ষা শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
আজকের দিনে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের, যাঁরা নিয়মিত ও অনিয়মিত বাহিনী হিসেবে ১৯৭১ সালে লড়েছিলেন। তাঁরা তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রসমৃদ্ধ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ নয় মাস অকুতোভয় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। বাঙালির ঘরে ঘরে, গ্রামের পুকুরঘাটে, নদীতীরে, খেয়াঘাটে, মাঠে, শহর-অঞ্চলে যে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার তখন শুধু রাজনৈতিক দাবি ছিল না, বরং ইতিহাসের এক অপরিহার্য পরিণতি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ছিল কেবল একটি সামরিক কাঠামো নয়, ছিল জাতীয় ত্যাগ ও আত্মদানের প্রতীক। মুজিবনগর সরকার গঠনের পর চৌকস নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা হয়, প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়, মিত্রবাহিনীর সঙ্গে যৌথ কৌশল প্রণয়ন করা হয়। এই সশস্ত্র বাহিনীর জন্ম হয়েছিল বাঙালির অবিনশ্বর মনোবল থেকে। সেই বীর যোদ্ধাদের কেউ ছিল ছাত্র, কেউ শ্রমিক, কেউ কৃষক; কেউ শহুরে তরুণ, কেউ সীমান্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ; কিন্তু তাঁদের পরিচয়ের উপরে ছিল আরেকটি পরিচয়, তাঁরা ছিলেন স্বাধীনতার সৈনিক।
যে যোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন, তাঁদের রক্তে স্বাধীনতার পথ রঞ্জিত হয়েছে। তাঁদের সম্মিলিত বীরত্ব গড়ে তুলেছিল লৌহসম দৃঢ়তা, গড়ে তুলেছিল স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিত্তি। তাঁদের ছাড়া স্বাধীনতা অসম্ভব ছিল।
আমরা আজ গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি ৩০ লাখ শহীদকে, যারা এই মাটির জন্য আত্মোৎসর্গ করেছিলেন। তাঁদের আত্মদানই আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিত্তি। তাঁদের রক্তে রাঙা পতাকাই আজকের বাংলাদেশ। ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় তাঁদের নাম লেখা রয়েছে অক্ষয় অক্ষরে। তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের প্রজন্মের কাছে শুধু স্মৃতি নয়, বরং পরম শ্রদ্ধার দায়, যা আমরা পরম যত্নে ধারণ করি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর যে বর্বরতা, তা পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম নৃশংস গণহত্যার উদাহরণ। নিরস্ত্র বাঙালির ওপর চালানো হয়েছিল গণহত্যা, নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, গ্রাম ধ্বংস, সাংস্কৃতিক নিধন। তাদের লক্ষ্য ছিল বাঙালি জাতিকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ও সামাজিকভাবে ধ্বংস করা। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে চালানো হয়েছিল বিশেষ হামলা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছিল পরিকল্পিতভাবে।
এই বর্বরতা শুধু পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ছিল না, ছিল তাদের স্থানীয় দোসর রাজাকার, আলবদর এবং আলশামস বাহিনীরও। তারা বাঙালির বিরুদ্ধে বাঙালিকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। যুদ্ধাপরাধী ও বিশ্বাসঘাতকদের সেই ভূমিকা জাতিকে চিরদিনের জন্য লজ্জিত করে রেখেছে। ইতিহাস কখনো তাদের ক্ষমা করবে না। আজও সেই নাম উচ্চারণ করলে মানুষের শরীর শিহরিত হয়, কারণ তারা ছিল নিষ্ঠুরতার প্রতিচ্ছবি।
২৯ নভেম্বর নয়, ২১ নভেম্বর—এই তারিখটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মিত্রবাহিনীর আনুষ্ঠানিক সামরিক সহযোগিতা এবং বাংলাদেশের তিন বাহিনীর ঐক্যবদ্ধ কর্মকৌশল এই দিনটিতে প্রকৃত রূপ লাভ করে। আজকের দিনে আমরা শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নই, বরং জাতীয় চেতনা, আত্মগৌরব, দায়িত্ববোধ এবং সামরিক শৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবে সশস্ত্র বাহিনীর গৌরবময় ভূমিকা স্মরণ করি।
আজকের সশস্ত্র বাহিনী আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় অসামান্য অবদান রেখে চলেছে। জাতিসংঘ মিশনে বাংলাদেশের সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যরা বিশ্বের শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত। কিন্তু স্বাধীনতার মূল চেতনাকে ধারণ করেই তাঁদের প্রতিটি যাত্রা, প্রতিটি দায়িত্ব পালন অর্থবহ হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর এসে আমরা এক গভীর উদ্বেগের মুখোমুখি। দেশের অভ্যন্তরে এবং বাইরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। কখনো গবেষণার নামে, কখনো মতাদর্শগত বিদ্বেষের নামে, কখনো রাজনৈতিক সুবিধাবাদের কারণে— ইতিহাসকে বিকৃত করা হচ্ছে।
এখনকার প্রেক্ষাপটে বিশেষ উদ্বেগজনক হলো ইউনুস সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে খাটো করার প্রবণতা। নানা মঞ্চে, নানা আলোচনায়, বিভিন্ন প্রশাসনিক ও নীতি-প্রক্রিয়ায় মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। শহীদ, মুক্তিযোদ্ধা, বঙ্গবন্ধুর ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে উপস্থাপিত বানোয়াট ব্যাখ্যার মাধ্যমে। ইতিহাসের সত্যকে ধামাচাপা দিয়ে দেশের ভিত্তিকে দুর্বল করার এই প্রচেষ্টা একটি ভিন্নধর্মী আক্রমণ।
স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতি কোনো সাধারণ ভুল নয়, এটি একটি ভয়ংকর রাজনৈতিক চক্রান্ত। যারা বঙ্গবন্ধুর অবদানকে ছোট করে দেখাতে চায়, যারা শহীদদের আত্মদানকে তুচ্ছ করে, তারা আসলে এই রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে। কারণ বাংলাদেশের ইতিহাসের কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের কেন্দ্রে বঙ্গবন্ধু। এটিকে মুছে ফেলার মানে জাতির পরিচয় মুছে ফেলা।
আমরা তীব্র নিন্দা জানাই সেই সব অপচেষ্টার, যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করে, কিংবা জাতির পিতার নেতৃত্বকে অস্বীকার করে। এ ধরনের প্রচেষ্টা শুধু অনৈতিক নয়, রাষ্ট্রবিরোধী। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আত্মার ওপর আঘাত।
স্বাধীনতার জন্য বাঙালি যে লড়াই করেছে, তা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলেও এর আদর্শিক সংগ্রাম আজও চলমান। এখন আর শত্রু দৃশ্যমান পাকিস্তানি বাহিনী নয়, বরং শত্রু ভেতরের, যারা মিথ্যাচার, বিভ্রান্তি, ষড়যন্ত্র এবং ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে জাতিকে দুর্বল করতে চায়। মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন ভূখণ্ডের স্বাধীনতার জন্য, আজ আমাদের সংগ্রাম সত্য ইতিহাস রক্ষার জন্য।
আজ আমাদের প্রয়োজন সশস্ত্র বাহিনীর মতো শৃঙ্খলা, সততা, ঈমান, দেশপ্রেম এবং দায়িত্ববোধ। প্রয়োজন মুক্তিযোদ্ধার অগ্নিসাহস, যে সাহস দিয়ে আমরা সত্য রক্ষা করব, ইতিহাস রক্ষা করব, স্বাধীনতার চেতনাকে অক্ষুণ্ন রাখব।
সশস্ত্র বাহিনী দিবসে আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক, আমরা সত্য ইতিহাসকে রক্ষা করব। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া, পরিবার, সাংস্কৃতিক অঙ্গন—সবখানে মুক্তিযুদ্ধের সত্যকে তুলে ধরব। এই রাষ্ট্র জন্মেছে রক্তের বিনিময়ে, তাই এর সত্য কোনোভাবেই মুছতে দেওয়া হবে না।
শহীদদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতা না থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ যেন প্রজন্মের কাছে শুধু ইতিহাসের অধ্যায় না হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব যেন রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে এসে জাতীয় সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
সশস্ত্র বাহিনী দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় বাঙালির ত্যাগ, আত্মদান, অহংকার, সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার অগ্নিগর্ভ পথচলা। যাঁদের নেতৃত্বে, যাঁদের রক্তে, যাঁদের বীরত্বে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাঁদের প্রতি আজ আমাদের গভীরতম শ্রদ্ধা। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা, যারা রাষ্ট্ররক্ষায় আজও বীরত্বের সঙ্গে দায়বদ্ধ।
শহীদদের আত্মা শান্তিতে থাকুক, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আমাদের সম্মান চিরঅটুট থাকুক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আজও আমাদের পথ দেখাক। আর ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে হোক আমাদের অটল প্রতিরোধ। এই দেশ বঙ্গবন্ধুর, এই রাষ্ট্র মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তে অর্জিত, এই স্বাধীনতা ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগে অমর—একথা কখনো ভুলে যাওয়া যাবে না।
লেখক: এডিটর ইন চীফ, বায়ান্ননিউজ২৪।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন