মুক্তমত

মামদানির জয়: নিউইয়র্কে গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫ ০১:৩৮

নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানির জয় সেই প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার প্রতি নৈতিক প্রত্যাখ্যান, যারা রাজনৈতিক প্রভাবকে ন্যায়বোধ আর টাকাকে যোগ্যতা ভেবেছিল। বিপুল বিত্তশালী দাতাদের অনুদান, গণমাধ্যমের সন্দেহ, ইসলামভীতি এবং নিজের দলের নেতৃত্বের বিরোধিতার মধ্যেও মামদানি জয়ী হয়েছেন। তার এ জয় প্রমাণ করেছে—অর্থ ও প্রভাবের পুরোনো হিসাব এখন আর ক্ষমতার নিশ্চয়তা দেয় না। দশকের পর দশক ধরে ডেমোক্রেটিক পার্টির জাতীয় নেতৃত্ব সহানুভূতির ভাষা ব্যবহার করেছে, কিন্তু কাজ করেছে ধনী ও লবিস্টদের স্বার্থে। মামদানির প্রচারণা সেই ভণ্ডামিটাকে স্পষ্টভাবে ও সাহসের সঙ্গে উন্মোচন করেছে। তিনি তাত্ত্বিক বিষয় নয়, বরং শহুরে জীবনের মূল প্রশ্নটা তুলেছিলেন—কে এই শহরে থাকতে পারে? তার উত্তর ছিল সহজ এবং নৈতিক। তিনি বলেছেন, সরকারি উদ্যোগে বাসস্থান তৈরি, ভাড়াটিয়াদের সম্মান দিতে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং সর্বজনীন শিশু পরিচর্যা ও বিনামূল্যের সিটি বাস চালু করতে হবে। তিনি আরও প্রস্তাব দিয়েছেন, সাশ্রয়ী খাবারের জন্য সরকারি মালিকানাধীন মুদি দোকান স্থাপন করতে হবে, যাতে ক্ষুধা থেকে মুনাফা করা বেসরকারি চেইনগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙা যায়। ধনীদেরও ন্যায্য অংশের কর দিতে হবে। এ প্রতিশ্রুতি তিনি দৃঢ়ভাবে দিয়েছেন। মামদানিকে আলাদা করেছে শুধু তার কর্মসূচির বিষয়বস্তু নয়, বরং যে খোলামেলা স্পষ্টতায় তিনি তার ভিত্তি তুলে ধরেছেন তা হলো— সরকারের কাজ হচ্ছে পরিশ্রমী মানুষের সেবা করা, লবিস্টদের নয়। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, এ শহর নাগরিকদের, কোনো প্রভাবশালী ঠিকাদার, ব্যাংকার বা দাতার নয়। তার প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যান্ড্রু কুয়োমো সে ধরনের রাজনীতির প্রতীক, যেটিকে ভোটাররা এখন ঘৃণা করে। ওয়াল স্ট্রিটের কর্তা এবং বহুদিন ধরে অর্থ দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব কিনে নেওয়া দাতাদের সমর্থনে কুয়োমো কেলেঙ্কারির দাগ মুছে ক্ষমতার মাধ্যমে নিজেকে পুনর্বাসিত করতে চেয়েছিলেন। তার প্রচারণা ছিল অভিজ্ঞতার মুখোশে লুকানো অহংকারের পাঠ্যপুস্তক। কিন্তু যত বিজ্ঞাপন, সমর্থন আর দাতার টাকা খরচই হোক না কেন, ভোটাররা ভালো করেই জানতেন তিনি ও তার পৃষ্ঠপোষকেরা এমন এক ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রতীক, যা বিবেকহীনভাবে শুধু ধনীদের সেবা করলেই পুরস্কৃত করে। এর চেয়েও লজ্জাজনক ছিল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বের আচরণ। কুয়োমো যে একাধিক যৌন অসদাচরণের অভিযোগে গভর্নরের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন, তা সবাই জানত। তবুও দলের অনেক প্রভাবশালী নেতা তাকে সমর্থন দিয়েছিলেন। এতে স্পষ্ট হয়, সততার প্রতি তাদের ঘোষিত অঙ্গীকার আসলে শর্তসাপেক্ষ। আর তাদের নৈতিক দিকনির্দেশনা চলে দাতাদের স্বার্থে। কুয়োমোকে তারা যেমনভাবে রক্ষা করেছিল, তা রিপাবলিকানদের ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আঁকড়ে ধরার আচরণ থেকে আলাদা ছিল না। দুই ক্ষেত্রেই দেখা গেছে—মূল্যবোধহীন রাজনীতি, যেখানে একমাত্র লক্ষ্য ক্ষমতা টিকে থাকা এবং নিজেকে টিকিয়ে রাখা। প্রাইমারি বিতর্কের সময় ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা একে একে ঘোষণা করছিলেন, নির্বাচিত হলে তাদের প্রথম বিদেশ সফর হবে ইসরায়েলে। কিন্তু মামদানি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, তিনি নিউইয়র্কের মেয়র হতে চাইছেন, কোনো পররাষ্ট্র দূত নন। তাই ইসরায়েল ভ্রমণের কোনো ইচ্ছাই তার নেই। তার এই খোলামেলা বক্তব্যে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ হতবাক হয়। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতৃত্ব ও অনেক গণমাধ্যম মতে, তার এ অবস্থান ছিল ইসরায়েলপন্থি লবির তুষ্টি নাকচ করার ইঙ্গিত। তাকে এক ধরনের অযোগ্য হিসেবে তুলে ধরেছিল। কিন্তু ভোটাররা ভিন্নভাবে ভাবলেন। তারা ভণ্ডামির বদলে সততা আর সাজানো রাজনীতির বদলে নীতিকে বেছে নিলেন। কুয়োমোর সমর্থকরা মামদানিকে ‘সমাজতন্ত্রী’ বলে আক্রমণ করলে পুরোনো ভয় দেখানোর কৌশল এবার ব্যর্থ হলো। নিউইয়র্কের মানুষ বুঝতে পারলেন ট্রাম্প যাকে ‘কমিউনিজম’ বলছেন সেটি আসলে জনগণের সম্পদ, জনগণের প্রয়োজনে ব্যবহারের অঙ্গীকার ছাড়া আর কিছু নয়। মামদানিকে আরও অভিযুক্ত করা হয় ইহুদিবিরোধী (অ্যান্টিসেমিটিক) হওয়ার অভিযোগে। কারণ, তিনি জায়নবাদের সমালোচনা করেছিলেন এবং গাজায় ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞের নিন্দা জানিয়েছিলেন। একসময় যে অভিযোগ সত্যিকার ঘৃণার বিরুদ্ধে সতর্ক করত, তা এখন এত বেশি এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহৃত হয়েছে যে, তার নৈতিক মূল্য প্রায় হারিয়ে গেছে। ভোটাররা বিষয়টি বুঝে নিয়েছিলেন এবং এতে প্রভাবিত হননি। এই দুটি অভিযোগই প্রত্যাখ্যান করে নিউইয়র্কের জনগণ দেখিয়ে দিলেন নৈতিক স্পষ্টতা ও মানবিক সহমর্মিতা কোনো উগ্র ধারণা নয়; বরং একান্ত প্রয়োজনীয় গুণ। কুয়োমো ও তার সহযোগীরা সূক্ষ্ম রাজনীতি ছেড়ে প্রকাশ্য বর্ণবাদ ও ইসলামভীতিতে নেমে পড়েছিলেন। মামদানির জয় সেই অপচেষ্টার জবাব, যা তার ধর্মকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। এটি প্রমাণ করেছে যে, নিউইয়র্কের ভোটাররা ভয় কিংবা কুসংস্কারের রাজনীতি নয়, ন্যায় ও নীতির রাজনীতিকেই সমর্থন করেন। নির্বাচনে নৈতিক বিভাজন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা দিয়েছিল ইসরায়েল প্রশ্নে। মামদানি এমন কিছু করেছেন, যা খুব কম আমেরিকান রাজনীতিক করার সাহস দেখিয়েছেন। তিনি ইসরায়েলকে একটি ‘ইহুদি রাষ্ট্র’ হিসেবে স্থায়ী বৈষম্যের ওপর দাঁড় করানোর ধারণা স্বীকার করতে অস্বীকার করেন। তিনি গাজায় ইসরায়েলের হামলাকে গণহত্যা বলে নিন্দা জানান এবং জোর দিয়ে বলেন, ন্যায়বিচার বেছে বেছে করা যায় না। অন্যদিকে, কুয়োমো এমন এক সুযোগসন্ধানী অবস্থান নেন, যা প্রায় হাস্যকর পর্যায়ে পৌঁছায়। তিনি ঘোষণা দেন, যদি কখনো ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গণহত্যার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হন, তিনি তার পক্ষে লড়বেন। কুয়োমো প্রকাশ্যে ইসরায়েলের জাতিগত জাতীয়তাবাদী পরিচয়ের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন এবং মামদানির অবস্থানকে ‘উগ্রতা’ বলে আখ্যা দেন। বাস্তবে ভোটারদের চোখে উগ্র ছিলেন কুয়োমোই। ক্ষমতার নিজস্ব স্বার্থরক্ষা আর দাতাদের তুষ্টির জন্য নৈতিক অন্ধত্বই ছিল তার প্রকৃত চেহারা। গণরোষের পুরোনো নাটকীয়তা এবার ভোটারদের নাড়া দিতে পারেনি। তরুণ প্রজন্ম, যারা ইসরায়েল সমালোচনার পুরোনো নিষেধাজ্ঞায় বন্দি নয়, তারা ভণ্ডামির আড়াল ভেদ করে সত্য দেখতে পেরেছে। তারা গাজা থেকে আসা নির্মম দৃশ্যগুলো নিজের চোখে দেখেছে, কোনো ফিল্টার ছাড়াই, কোনো মিডিয়ার ব্যাখ্যা ছাড়াই। তাই তারা আর বিশ্বাস করে না সেই পুরোনো গল্প, ইসরায়েল ‘মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র গণতন্ত্র’। এখন অনেকেই নির্ভয়ে বলছেন, ইসরায়েল আসলে একটি বর্ণবৈষম্যমূলক রাষ্ট্র। তারা আর মনে করে না যে, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতি দেখানো মানে ধর্মদ্রোহিতা, কিংবা নৈতিক স্পষ্টতা প্রকাশ করা মানে লবিস্টদের খুশি না করা। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বের আচরণও সমানভাবে অনেক কিছু প্রকাশ করেছে। মার্কিন সিনেটর চাক শুমার প্রকাশ্যে কোনো সমর্থন দেননি আর প্রতিনিধি হাকিম জেফরিস সমর্থন জানিয়েছিলেন ভোট শুরুর আগের শেষ দিনে, যখন মামদানির জয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে। তাদের এই দোদুল্যমানতা দেখিয়েছে, পার্টির নেতৃত্ব এখনো দাতাদের চিন্তাধারার বন্দি—যেখানে অর্থনীতির যুক্তি ঠিক করে ওয়াল স্ট্রিট আর বক্তব্যের সীমা নিয়ন্ত্রণ করে ইসরায়েলপন্থি লবি। এটি সতর্কতা নয়, বরং অপ্রাসঙ্গিকতার প্রমাণ। যেসব ভোটারকে নেতৃত্ব দেওয়ার দাবি তারা করে, তারা এরই মধ্যে সেই পুরোনো চিন্তা ছেড়ে এগিয়ে গেছেন। মামদানির বিজয় এক প্রজন্মের বিদ্রোহের পরিণতি। তরুণ ও প্রগতিশীলরা ক্লান্ত সেই পুরোনো উপদেশ শুনে—‘ব্যবস্থাটা নিখুঁত না হলেও মেনে নিতে হবে’। তারা দেখেছে, তাদের ভবিষ্যৎ ঋণের ভারে বিকিয়ে গেছে, তাদের রোজগার ভাড়ার পেছনে শেষ হয়ে যায়। আর তাদের আদর্শকে তুচ্ছ করে সেই রাজনীতিকরা যারা নৈতিক আপসকে যথার্থ বলে মনে করেন, এখন তারা আর খুশি নয় ফাঁকা উদারতার বুলি কিংবা ‘সর্বজনীন মূল্যবোধ’-এর শূন্য কথায়। তারা এমন রাজনীতি চায় যা সত্য বলে, আর সেই সত্য অনুযায়ী কাজ করে। তাদের এ প্রতিবাদেই নতুন শুরুর বীজ নিহিত। প্রতিষ্ঠিত মহল এ ফলকে স্থানীয় কোনো ব্যতিক্রম বা শহুরে উগ্রতার ঝোঁক বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবে। কিন্তু এটা তার কিছুই নয়। এটি এক ধরনের রায়, একটি অভিযোগপত্র। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, ডেমোক্র্যাটিক পার্টি নৈতিক বিশ্বাসের বদলে তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, জনগণের আস্থা বিকিয়ে দিচ্ছে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রবেশাধিকারের বিনিময়ে। এটা এমন এক নেতৃত্বকে উন্মোচন করেছে, যারা জনগণের চেয়ে বেশি অনুগত ওয়াল স্ট্রিট আর ইসরায়েলপন্থি লবির প্রতি। নিউইয়র্কের বার্তাটা স্পষ্ট। আমেরিকার সবচেয়ে জটিল ও বৈচিত্র্যময় এ শহরের নাগরিকরা, এখানে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি ইহুদি জনসংখ্যা বসবাস করে। এ শহরের মানুষ ভণ্ডামি আর আত্মসমর্পণের রাজনীতি মেনে নিচ্ছেন না। তারা সেই ভ্রান্ত ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে যে, নৈতিক স্পষ্টতা নাকি সবসময় টাকার প্রভাবে নরম হতে হবে। মামদানিকে নির্বাচিত করে নিউইয়র্কবাসী তাদের গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে নিয়েছেন, তাদের কাছ থেকে যারা একে বিক্রি করে দিয়েছিল। তারা গোটা দেশকে মনে করিয়ে দিয়েছে, নীতিবোধ এখনো ক্ষমতাকে হার মানাতে পারে, বিবেক এখনো পুঁজির চেয়ে শক্তিশালী হতে পারে আর যে দল ওয়াল স্ট্রিটের সেবা করে এবং সত্যকে ভয় পায়, সে জনগণের মুখপাত্র হওয়ার ভান করতে পারে না। এ জয় যদি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতৃত্বকে তাদের নৈতিক ঘুম থেকে না জাগায়, তবে এটি এমন এক নতুন প্রজন্মকে জাগিয়ে তুলবে, যারা সেই নেতৃত্বকে বদলে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। লেখক: হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটি স্কুল অব ল’র আইন বিভাগের অধ্যাপক। ১৯৯৫ সাল থেকে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন কেপে পরিচালিত তুলনামূলক ও আন্তর্জাতিক আইন কর্মসূচির পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানের অধিবাসী এবং দেশটির মুক্তি আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।

আলজাজিরায় প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ ।

মুক্তমত থেকে আরো পড়ুন