মুক্তমত

উত্তেজনার লাইভ কি সাংবাদিকতার মরণফাঁদ?

প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারী ২০২৬ ০৩:৪৪

মুনওয়ার আলম নির্ঝর: সেদিন একটি নামী সংবাদমাধ্যমের ফেইসবুক লাইভ চলছিল। রিপোর্টার বেশ চড়া গলায়, উত্তেজিত ভঙ্গিতে কথা বলছিলেন। তার বাচনভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল এটি সংবাদ সংগ্রহ নয় বরং কোনো খেলার মাঠের উত্তেজনাপূর্ণ ধারাভাষ্য। এই কৃত্রিম উত্তেজনা তৈরি করতে গিয়েই হঠাৎ একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও ‘বেফাঁস’ কথা তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল। কথাটি বলার পর যখন তিনি নিজের ভুল বুঝতে পারলেন, ততক্ষণে কয়েক হাজার দর্শক তা শুনে ফেলেছেন। পরবর্তী কয়েক মিনিট সেই ভুল ঢাকতে গিয়ে তিনি তোতলাচ্ছিলেন, চেহারায় ফুটে উঠেছিল তীব্র আতঙ্ক। একটি লাইভ রিপোর্ট নিমেষেই এক বিশ্রী ছন্দপতনের উদাহরণ হয়ে দাঁড়াল। দ্রুত লাইভটি শেষ করে তিনি বিদায় নিলেন ঠিকই, কিন্তু রেখে গেলেন বিরাট প্রশ্নচিহ্ন! আমরা কি সাংবাদিকতা করছি, নাকি সস্তা বিনোদনের ফেরিওয়ালা হয়ে উঠেছি?

ঢাকার মূলধারার সংবাদপত্র, অনলাইন নিউজ পোর্টাল এমনকি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও এখন ‘নিউমিডিয়া’ বা ‘মাল্টিমিডিয়া’ বা 'মোজো' সাংবাদিকতার দিকে ঝুঁকছে। কিন্তু এই রূপান্তর যতটা প্রযুক্তিনির্ভর, তার চেয়ে অনেক কম প্রশিক্ষণনির্ভর। ফলে সাংবাদিকতা এখন দিন দিন বহুমুখী সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

বর্তমান সময়ের নিউ মিডিয়া রিপোর্টারদের মানসিক গঠন বিশ্লেষণ করলে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তারা নিজেদের একজন ‘নিরপেক্ষ সাংবাদিক’ হিসেবে দেখার চেয়ে একজন ‘জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার’ হিসেবে দেখতে বেশি পছন্দ করছেন।


লাইভ চলাকালীন স্ক্রিনে যখন দর্শক সংখ্যা বাড়তে থাকে, তখন রিপোর্টারের মস্তিষ্কে এক ধরনের ‘অ্যাড্রেনালিন রাশ’ তৈরি হয়। এই উত্তেজনা বজায় রাখতে গিয়ে তারা সাধারণ তথ্যকেও নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করেন। চড়া গলা, দ্রুত কথা বলা এবং কৃত্রিম উত্তেজনা তৈরি করা তাদের আচরণের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কমেন্ট সেকশনে মানুষের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখার সুযোগ থাকায় রিপোর্টাররা জনতুষ্টিবাদী হয়ে পড়েন। তারা সত্যের চেয়ে দর্শক যা শুনতে চায় বা যাতে দর্শক চমকে যাবে, এমন কিছু বলার তাড়না অনুভব করেন। যেটা এখনকার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ফেইসবুক লাইভ দেখলে আপনারাও টের পাবেন।

সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো ‘গেটকিপিং’। একটি সংবাদ প্রকাশের আগে সেটি একাধিক স্তরে যাচাই-বাছাই ও পরিমার্জন করা হয়। কিন্তু ফেইসবুক লাইভ বা তাৎক্ষণিক ভিডিও কন্টেন্টের ক্ষেত্রে এই গেটকিপিং পুরোপুরি অনুপস্থিত। আগে একজন রিপোর্টার তথ্য আনতেন, সাব-এডিটর বা নিউজ এডিটর সেটি কাটছাঁট করতেন। এখন রিপোর্টার নিজেই নিজের এডিটর। ফলে আবেগপ্রসূত বা পক্ষপাতদুষ্ট কথা সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। আর অনেক সময় রিপোর্টার নিজেও বুঝতে পারছেন না তিনি কি শব্দ ব্যবহার করেছেন। এটা আসলে যাওয়া উচিত না অনুচিত, সে বিবেচনাও করতে পারছেন না। কারণ তার অবচেতন মন বলে, তিনি সর্বোচ্চ সেরা শব্দটাই ব্যবহার করেছেন তার লাইভে। আবার অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমে লাইভ চলাকালীন নিউজরুম থেকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয় না। রিপোর্টার মাঠে কী বলছেন, তা দেখার কেউ নেই যতক্ষণ না কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটে।

এরমধ্যে সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের অতিবাণিজ্যিক আচরণের জন্য কর্মীদের ‘সাংবাদিক’ হিসেবে নয় বরং ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েটর’ হিসেবে ব্যবহার করছে। ফেইসবুক বা ইউটিউব থেকে আয়ের নেশায় সংবাদমাধ্যমগুলো এখন সংবাদের গুণগত মানের চেয়ে ভিউয়ারশিপকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। একজন রিপোর্টারকে টার্গেট দেওয়া হয়, মাসে কতগুলো ভিডিও ভাইরাল হলো। এই টার্গেট পূরণ করতে গিয়ে সাংবাদিকতার নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে তারা ‘ক্লিকবেট’ কন্টেন্ট তৈরি করছেন।


তার ওপর ভিউয়ের ওপর পুরস্কার এখন নতুন সংকট। আগে সাংবাদিকদের যাচাই করা হতো, তার প্রতিবেদন কতটা ভালো তা দেখে। আর এখন সাংবাদিক যাচাই করা হয়, কার প্রতিবেদন কতটা ভাইরাল হয়েছে তা দেখে।

আমাদের দেশের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমে নিউ মিডিয়া সেকশন খোলা হয়েছে হুজুগে পড়ে, কিন্তু নেই এর কোন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা। প্রতিষ্ঠানগুলোও এই সংবাদকর্মীদের জন্য সঠিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে না। অনেক সময় দেখা যায় বীভৎস লাশের দৃশ্য, ভুক্তভোগীর পরিচয় কিংবা স্পর্শকাতর কোনো মুহূর্তে ক্যামেরা নিয়ে রিপোর্টার ঢুকে পড়ছেন। এছাড়া লাইভে কথা বলার টোন কেমন হবে, বিতর্কিত পরিস্থিতিতে কীভাবে শান্ত থাকতে হবে, এগুলোর ওপর কোনো কর্মশালা নেই। ফলে রিপোর্টাররা ইউটিউবারদের অনুকরণ করতে গিয়ে ধারাভাষ্যকারের মত আচরণ শুরু করেন।

এই বিশৃঙ্খল এবং লক্ষ্যহীন লাইভ সাংবাদিকতা কেবল একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, পুরো সাংবাদিকতা পেশার জন্য অস্তিত্বের সংকট তৈরি করছে। প্রথমত, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি এখন আকাশচুম্বী। লাইভে কথা বলার সময় এডিটিং বা রিটেকের কোনো সুযোগ থাকে না। ফলে সাংবাদিক যখন উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে কোনো ব্যক্তি, ধর্ম বা গোষ্ঠীকে নিয়ে বিতর্কিত বা ভুল তথ্য দিয়ে ফেলেন, তখন মুহূর্তেই সেটি ডিজিটাল নিরাপত্তা বা মানহানির মামলার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। প্রতিষ্ঠানের জন্য এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

অনেক সময় দেখা যায়, উত্তেজিত জনতাকে ক্যামেরার সামনে পেয়ে রিপোর্টার নিজেও উত্তেজিত হয়ে পড়েন। কোনো অভিযুক্তকে সরাসরি ‘অপরাধী’ বলে রায় দিয়ে দেওয়া বা কারো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ণ করা সাংবাদিকতার নীতিবিরোধী। কিন্তু ভিউ পাওয়ার আশায় যখন রিপোর্টাররা তদন্তকারী কর্মকর্তার মতো আচরণ শুরু করেন, তখন তা জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ায় এবং অনেক ক্ষেত্রে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে। অতীতে আমরা অনেক জায়গায় এই ঘটনা দেখেছি। বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রোগ্রামে এটা প্রায় কমন ঘটনা।

এই বহুমুখী সংকট থেকে মুক্তির জন্য এখন আমূল সংস্কার প্রয়োজন। এটি কেবল রিপোর্টারের একার পক্ষে সম্ভব নয়, প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতিগত পরিবর্তন এখানে মুখ্য। একটি শক্তিশালী সম্পাদকীয় নীতিমালা প্রণয়ন হবে সমাধানের প্রথম ধাপ। প্রতিটি সংবাদমাধ্যমকে সুনির্দিষ্টভাবে ঠিক করে দিতে হবে যে, লাইভে কোন ধরনের শব্দ ব্যবহার করা যাবে এবং কোনগুলো বর্জনীয়। রিপোর্টারের গলার স্বর এবং বাচনভঙ্গি হবে শান্ত ও তথ্যবহুল, কোনোভাবেই তা উত্তেজিত ধারাভাষ্যের মতো হওয়া চলবে না।

লাইভ চলাকালীন নিউজরুম থেকে একজন অভিজ্ঞ এডিটর সরাসরি রিপোর্টারের কানে নির্দেশনা দেওয়ার মতো ব্যবস্থা থাকা জরুরি। লাইভ গেটকিপিং আর কি। ফেইসবুক লাইভেও প্রযুক্তি ব্যবহার করে রিপোর্টারকে মাঠ থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যদি দেখা যায় রিপোর্টার খেই হারিয়ে ফেলছেন বা ভুল তথ্য দিচ্ছেন, তবে স্টুডিও থেকে তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ করে লাইভটি নিয়ন্ত্রণ করা বা প্রয়োজনে বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভিউকেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা। সংবাদপত্রের কর্তৃপক্ষকে বুঝতে হবে যে, একটি ভুল লাইভ থেকে আসা কয়েক লাখ ভিউ প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের অর্জিত সম্মান এক মিনিটে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে। তাই রিপোর্টারদের মূল্যায়নের মাপকাঠি হওয়া উচিত তাদের খবরের নির্ভুলতা এবং তথ্যের গভীরতা, ভিডিওর রিচ বা কমেন্ট সংখ্যা নয়। নিয়মিত কর্মশালা এবং নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে রিপোর্টারদের মনে করিয়ে দিতে হবে যে, তারা মূলত একজন সাংবাদিক, কোনো ইউটিউবার বা বিনোদন দাতা নন। সাংবাদিকতা একটি দায়বদ্ধতার জায়গা, যেখানে ‘দ্রুত হওয়ার’ চেয়ে ‘নির্ভুল হওয়া’ অনেক বেশি জরুরি।

মুক্তমত থেকে আরো পড়ুন