বাংলাদেশ

মাগুরছড়া ট্র্যাজেডির ২৯ বছর, এখনো মেলেনি হাজার কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ ০৪:২০

আবুল কাশেম রুমন:  বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনাগুলোর একটি মাগুরছড়া গ্যাসক্ষেত্র বিস্ফোরণের ২৯ বছর পূর্ণ হয়েছে। ১৯৯৭ সালের ১৪ জুন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাগুরছড়ায় সংঘটিত এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, জীববৈচিত্র্য ও অবকাঠামোর অপূরণীয় ক্ষতি হলেও এখনো দায়ী বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারেনি বাংলাদেশ।

মাগুরছড়া ট্র্যাজেডি শুধু একটি গ্যাসকূপ বিস্ফোরণের ঘটনা নয়, এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ, বহুজাতিক কোম্পানির জবাবদিহি এবং জাতীয় সম্পদ রক্ষার প্রশ্নে আজও একটি আলোচিত অধ্যায়।

ভয়াবহ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল মাগুরছড়া

১৯৯৭ সালের ১৪ জুন মধ্যরাতে কমলগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ী চা-বাগান সংলগ্ন মাগুরছড়া গ্যাসক্ষেত্রের ১ নম্বর অনুসন্ধান কূপে খননকাজ চলাকালে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের পর প্রায় ৬০০ ফুট উঁচু আগুনের শিখা আকাশে উঠে যায় এবং টানা প্রায় ছয় মাস ধরে আগুন জ্বলতে থাকে।

মার্কিন কোম্পানি অক্সিডেন্টাল অব বাংলাদেশ লিমিটেড ১৯৯৫ সালে সরকারের সঙ্গে চুক্তির আওতায় ওই এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করে। প্রায় ৩ হাজার ৭০০ মিটার গভীরতায় খননের পরিকল্পনা থাকলেও মাত্র ৮৪০ মিটার খননের পরই ঘটে এই বিপর্যয়।

পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞ দল দীর্ঘ চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলেও কূপটি পুরোপুরি সিল করতে সময় লাগে ১৯৯৮ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত।

বিপুল ক্ষয়ক্ষতি

তেল-গ্যাস বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, বিস্ফোরণে প্রায় ২৪৫ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) উত্তোলনযোগ্য গ্যাস পুড়ে যায়, যার বর্তমান মূল্য প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। অন্যান্য পরিবেশগত ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতিসহ মোট ক্ষতির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়—

প্রায় ৮৭ দশমিক ৫ একর এলাকা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অন্তত ৬৯ দশমিক ৫ হেক্টর ভূমি প্রায় ২৫ হাজার ৬৫০টি পূর্ণবয়স্ক গাছ ২৯টি চা-বাগান সিলেট-আখাউড়া রেললাইন সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গ্যাস পাইপলাইন বিদ্যুৎ লাইন খাসিয়া পানের বরজ

এ ছাড়া হাজার হাজার বন্যপ্রাণী, পাখি ও বিরল উদ্ভিদেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানেও ভয়াবহ প্রভাব

মাগুরছড়া গ্যাসক্ষেত্রের পাশেই অবস্থিত দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। বিস্ফোরণের আগুন ও তাপে বনাঞ্চলের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বহু বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যায়।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম বলেন, বনাঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিরূপণ করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়নি। প্রাকৃতিক বনের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়।

ক্ষতিপূরণ আজও অধরা

দুর্ঘটনার প্রায় তিন দশক পার হলেও বাংলাদেশ এখনো দায়ী প্রতিষ্ঠান অক্সিডেন্টালের কাছ থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারেনি। জাতীয় তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠন অভিযোগ করে আসছে, খননকাজে অবহেলা, অনভিজ্ঞতা ও নিরাপত্তা মানদণ্ড না মানার কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছিল।

দুর্ঘটনার পর অক্সিডেন্টাল বাংলাদেশ ত্যাগ করলেও ক্ষতিপূরণ আদায়ের প্রশ্নে কার্যকর কোনো অগ্রগতি হয়নি।

আন্দোলন অব্যাহত

মাগুরছড়া ট্র্যাজেডির ক্ষতিপূরণ আদায় এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের দাবিতে স্থানীয় জনগণ ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছে।

২৯তম বার্ষিকী উপলক্ষে কমলগঞ্জে পাহাড় রক্ষা উন্নয়ন সোসাইটি, জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি, কমলগঞ্জ উন্নয়ন পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। কর্মসূচি থেকে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং কমলগঞ্জের ঘরে ঘরে গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

মাগুরছড়া ট্র্যাজেডির ২৯ বছর পরও ক্ষতিপূরণ, পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং জাতীয় সম্পদ রক্ষায় দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা এখনো রয়ে গেছে।

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন