
আর মাত্র কয়েকদিন পরেই জিলহজ মাস শুরু হবে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হজযাত্রীরা হজ পালনের উদ্দেশ্যে পবিত্র মক্কায় সমবেত হতে শুরু করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘মক্কা শরিফ পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর আল্লাহর জন্য হজ আদায় করা ফরজ’ (সূরা: আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭)। ইসলামের এ ফরজ বিধানটি সঠিকভাবে পালন করার জন্য কিছু বিধানাবলী রয়েছে। হজ আদায়ে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য এসব বিধানের প্রতি লক্ষ রাখা আবশ্যক।
হজের ফরজ: হজের তিনটি ফরজ রয়েছে যথা:- (১) ইহরাম বাঁধা (২) উ’কুফেউক (আরাফার ময়দানে অবস্থান করা) (৩) তাওয়াফে জিয়ারাত (চার চক্কর পরিমাণ)। (১) ইহরাম বাঁধা অর্থাৎ হজের নিয়ত করাঃ- : ‘হে আল্লাহ! আমি হজ উমরা এবং কাবাগৃহ তাওয়াফের জন্য নিয়ত করলাম। তুমি তা কবুল কর।’ ইহরামের কাপড় পরিধান করার পর নামাজের মাকরুহ সময় না হলে মাথা ঢেকে দুই রাকাআত নফল নামাজ আদায় করা মুস্তাহাব। নামাজ পড়ে মাথার কাপড় খুলে ফেলতে হবে এবং যেই হজের ইচ্ছা করবে মনে মনে সেই হজের নিয়ত করে ইহরামের ‘তালবিয়াহ ‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা-শারিকালাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা, লাকা ওয়াল মুল্ক লা-শারিকালাক’। পাঠ করা। (২) আরাফাহ ময়দানে অবস্থান করা: জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজরের পর থেকে সূর্যাস্ত যাওয়া পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা। (৩) তাওয়াফে জিয়ারাত: অর্থাৎ মক্কা শরিফ পৌঁছার পর সর্বপ্রথম কাজটি হলো চারবার কাবাগৃহটি প্রদক্ষিণ করা আবার হজের কাজ শেষ করে বাড়িতে ফেরার সময় সর্বশেষ কাজ হলো তিনবার কাবাগৃহ প্রদক্ষিণ করে রওনা হওয়া।
হজের ওয়াজিব: হজের মধ্যে ওয়াজিব কাজ মোট ৮ টি যথা:- (১) মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধা: ইবনু ‘আববাস (রা.) থেকে বর্ণিত যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনাবাসীদের জন্য মিকাত নির্ধারণ করেন যুল-হুলায়ফাহ, সিরিয়াবাসীদের জন্য জুহফা, ইয়ামানবাসীদের জন্য ইয়ালামলাম ও নাজদবাসীদের জন্য ক্বারণ। উল্লিখিত স্থানসমূহ হজ ও ‘ওমরাহ’র নিয়তকারী সে স্থানের অধিবাসী এবং সে সীমারেখা দিয়ে অতিক্রমকারী অন্যান্য এলাকার অধিবাসীদের জন্য ইহরাম বাঁধার স্থান। আর যে মীকাতের ভেতরের অধিবাসী সে নিজ বাড়ি হতে ইহরাম বাঁধবে। এমনকি মক্কাবাসীরা মক্কা হতেই ইহরাম বাঁধাবে। (সহিহ বুখারী,হাদিস নম্বর:১৫২৯)। (২) সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত আরাফাতে অবস্থান করা: । (৩) আরাফায় অবস্থান করা: আরাফার দিন শেষে ঈদের রাত ফজর পর্যন্ত মুযদালিফায় অবস্থান করা যতক্ষণ আকাশ প্রস্ফুটিত না হয়। তবে নারী ও দুর্বল পুরুষদের জন্য মধ্য রাতের পর মুযদালিফা ত্যাগ করা বৈধ আছে। (৪) আইয়ামে তাশরিকের অর্থাৎ (১১.১২ ও ১৩ তারিখের ) রাত্রিগুলি মিনা এলাকায় কাটানো।: (৫) আইয়ামে তাশরিকের দিনগুলোতে তিন জামারাতেই কঙ্কর তথা পাথর নিক্ষেপ করা:। (৬) দশ তারিখ ঈদের দিনে জামারাতুল আকাবাতে বা সর্বশেষ বড় পাথর মারার স্থানে পাথর নিক্ষেপ করে মাথার চুল মুণ্ডন করা অথবা ছোট করা:। (৭) শুধু মাত্র কিরান ও তামাততু হজ পালনকারীদের জন্য হাদয়ী তথা হজের কোরবানি করা। (৮). সবার জন্য বিদায়ী তাওয়াফ করা।
হজের সুন্নতসমূহ: (১) মিকাতের বাইরে থেকে আগত ইফরাদ ও কেরান হজ পালনকারীর জনু তাওয়াফে কুদুম করা। (ইফরাদ হজ পালনকারী মক্কা পৌঁছে এবং কেরা হজ পালনকারী ওমরার কার্য সম্পাদন করে মাথার চুল না কেটেই তাওয়াফে কুদুম করা। (২) তাওয়াফে কুদুমের পর যদি হজের সায়ী করার ইচ্ছা থাকে, তবে তাতে রমল ও ইযতিবা করা (আর তাওয়াফে কুদুমের পরে হজের সায়ী করার ইচ্ছা না থাকলে তাতে রমল ও ইযতিবা করতে হবে না। (৩) সাফা মারওয়ায় সায়ীর সময় সবুজ দুপিলারের মধ্যবর্তী স্থান পুরুষের জন্য দৌঁড়ে অতিক্রম করা এবং অবশিষ্ট স্থান হেঁটে চলা। (৪) ৮ জিলহজ বাদ ফজর মিনার উদ্দেশ্যে রওয়া হওয়া এবং তথায় পাঁচ ওয়াক্ত সালাত (নামাজ) আদায় করা। (ভিড় এড়াবার লক্ষ্যে বা অন্য কোনো কারণে ফজরের পূর্বে ও রাতে রওনা দেয়াও জায়েজ।) (৫) ৯ জিলহজ সূর্যোদয়ের পর মিনা হতে আরাফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া। পূর্বে ও রাতে যাওয়াও দিবাগত রাত্রে মুযদালিফায় থাকা। (কোনো অসুবিধার কারণে বা ভিড় এড়াবার লক্ষ্যে বা অন্য কোনো কারণে ফজরের পূর্বে ও রাতে রওনা হওয়াও জায়েজ।) (৬) আরাফা থেকে সূর্যাস্তের পর ধীরস্থীরভাবে মুযদালিফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া। (৭) ৯ যিলহজ্জ সূর্যাস্তের পর আরাফা থেকে মুযদালিফায় এসে রাতযাপন করা। (উল্লেখ্য, মুযদালিফায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত সময়ের মধ্যেই কিছুক্ষণ উকুফ বা অবস্থান করা ওয়াজিব, সুবহে সাদিকের পূর্বে অবস্থান করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ।) (৮) আরাফার ময়দানে গোসল করা। (৯) ৮ যিলহজ দিনগত রাতসহ মিনায় অবস্থানের দিনগুলোয়তে রাতযাপনও মিনাতে করা। উক্ত সুন্নতসমূহ থেকে কোনো সুন্নত স্বেচ্চায় ছেড়ে দেয়া ঠিক নয়। অবশ্য ছেড়ে দেয়ার দ্বারা সদকা ইত্যাদিও ওয়াজিব হবে না, তবে সওয়াব থেকে বিরত হবে। এ ছাড়াও বিভিন্ন আমলের মাঝে আরো অনেক সুন্নত রয়েছে।
ইহরাম অবস্থায় বর্জনীয় বা নিষিদ্ধ কাজ: যেমন- (১) মাথার চুল মুণ্ডন করা: ‘আর তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা মুণ্ডন করবে না, যতক্ষণ না কোরবানির পশু যথাস্থানে পৌঁছে যাবে।’ (সূরা: আল বাকারা, আয়াত: ১৯৬)। (২) ইহরাম বাঁধার পর সুগন্ধি ব্যবহার করা: (৩) স্ত্রী সহবাস করা এবং ঝগড়া করা । (৪) উত্তেজনাসহ স্ত্রীকে ছোঁয়া। (৫) কোনো শিকার হত্যা করা: (৬) ইহরাম অবস্থায় পুরুষের জন্য বিশেষ নিষিদ্ধ বিষয়াবলীর মধ্যে রয়েছে, জামা, টুপি, পায়জামা, পাগড়ি ও মোজা পরিধান করা। (৭) ইহরাম অবস্থায় নারীদের জন্য বিশেষ নিষিদ্ধ বিষয়াবলীর মধ্যে রয়েছে নেকাব। অনুরূপভাবে স্কার্ফ পরাও নিষিদ্ধ। ইহরাম অবস্থায় নারীরা মুখ খোলা রাখা শরীয়তসঙ্গত। তবে বেগানা পুরুষের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে মুখ ঢেকে নেবে; যে কাপড় দিয়ে মুখ ঢাকবে সেটা যদি মুখ স্পর্শ করে তাতে কোনো অসুবিধা নেই। আল্লাহ তায়ালা হজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নতের বিধি-বিধান মতে সকল হাজীদেরকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের তওফিক দান করুন। আমিন।
বিশ্ব থেকে আরো পড়ুন