লাইফস্টাইল

মানুষ যে কারণে অপমানের স্মৃতি ভুলতে পারে না

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৩:০৭

কিছু অপমান মানুষ কখনো ভুলে না

সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটা দিন। নিজের কাজে ব্যস্ত আছেন, হঠাৎই মস্তিষ্ক বহু বছর আগের কোনো এক পার্টিতে বলা বিব্রতকর একটা কথা আবার বাজিয়ে শোনাতে শুরু করে। হয়তো অন্য কেউ সেই মুহূর্তটা মনে রাখেইনি, ঘটনাটা হয়তো ততটা গুরুত্বপূর্ণও ছিল না, তবুও তা ফিরে আসে ঠিক সেদিনের মতোই স্পষ্ট আর অস্বস্তিকরভাবে। বাস্তবতা হলো, মস্তিষ্ক প্রায়ই বিব্রতকর স্মৃতিগুলোকে অবিশ্বাস্য নিখুঁতভাবে ধরে রাখে, অথচ সত্যিকারের প্রয়োজনীয় তথ্য সহজেই হারিয়ে যেতে দেয়।

সব স্মৃতি সমান গুরুত্ব পায় না

মানসিক ও আবেগিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে এমন যেকোনো অভিজ্ঞতা, তা লজ্জা, ভয়, আনন্দ বা গভীর অস্বস্তি যা-ই হোক না কেন, মস্তিষ্ক দৈনন্দিন সাধারণ তথ্যের চেয়ে অনেক বেশি যত্নসহকারে তা সংরক্ষণ করে। বিব্রতকর মুহূর্তে সাধারণত অন্যদের চোখে নিজের ভাবমূর্তির ওপর একটা আকস্মিক হুমকি জড়িয়ে থাকে, আর মস্তিষ্ক এমন সংকেতকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে দীর্ঘদিন ধরে রাখে। সড়কে বহু বছর আগের কোনো প্রায়দুর্ঘটনার স্মৃতি যেভাবে মনে গেঁথে থাকে, একই প্রক্রিয়ায় কাজ করে এটিও। সংক্ষেপে বলা যায়, আবেগের তীব্রতাই কোনো স্মৃতিকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।

কেন সামাজিক লজ্জা এত গভীরভাবে গেঁথে যায়

মস্তিষ্কের যে অংশ সামাজিক প্রত্যাখ্যান প্রক্রিয়া করে, সেটিই সক্রিয় হয় শারীরিক ব্যথার সময়ও। এই কারণেই লজ্জাজনক স্মৃতি এত জেদি মনে হয়, কারণ মস্তিষ্ক সামাজিক ব্যথাকে প্রায় শারীরিক ব্যথার মতোই প্রক্রিয়া করে। বিশেষত অন্যের সামনে লজ্জা পাওয়া একধরনের ভীতিকর প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, কারণ মানুষ স্বভাবতই কোনো না কোনো গোষ্ঠীর অংশ হয়ে থাকতে চায়। যখনই কোনো মুহূর্ত অন্যের চোখে নিজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে বলে মনে হয়, মস্তিষ্ক তাকে প্রায় শারীরিক আঘাতের মতোই গণ্য করে, এমন কিছু যা ভবিষ্যতে মনে রেখে এড়িয়ে চলতে হবে।

মস্তিষ্ক যা সমাধান করতে পারেনি, তা-ই বারবার মনে করিয়ে দেয়। কোনো লজ্জাজনক মুহূর্ত নিয়ে যদি খোলাখুলি কথা বলা না হয়, হাসিঠাট্টায় হালকা করা না হয়, বা সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা না হয়, তাহলে মস্তিষ্ক সেটিকে বারবার সামনে নিয়ে আসে, যেন এখনও বুঝে উঠতে পারেনি এটি নিয়ে ঠিক কী করা উচিত। এই কারণেই কাউকে কোনো বিব্রতকর গল্প বলে একসঙ্গে হেসে ফেললে পরবর্তীতে তার প্রভাব সত্যিই কমে যায়।

মস্তিষ্ক আসলে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছে

অস্বস্তিকর হলেও, বিব্রতকর স্মৃতি বারবার মনে করানো আসলে মস্তিষ্কের একধরনের শেখার প্রক্রিয়া। এর উদ্দেশ্য একই পরিস্থিতিতে যেন আবার না পড়তে হয় তা নিশ্চিত করা। এই স্মৃতি ফিরে আসার সময় যে অস্বস্তি অনুভূত হয়, তা আসলে মস্তিষ্কের শিক্ষাকে আরও দৃঢ় করার একটি পদ্ধতি। তত্ত্বগতভাবে এটি উপকারী হলেও, বাস্তবে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে ও অনেক বেশি মাত্রায় এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে, কারণ মস্তিষ্ক সবসময় বুঝতে পারে না ঠিক কখন এই শিক্ষা দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

স্পটলাইট এফেক্ট: নিজের ভুলকে অতিরিক্ত বড় করে দেখা

মানুষ প্রায়ই ধরে নেয়, তাদের করা কোনো বিব্রতকর কাজ অন্যরা অনেক বেশি লক্ষ্য করেছে এবং মনে রেখেছে। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় স্পটলাইট এফেক্ট। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী থমাস গিলোভিচ এবং তার সহকর্মীদের পরিচালিত একটি গবেষণায়, যা জার্নাল অব পার্সোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজিতে ২০০০ সালে প্রকাশিত হয়, দেখা গেছে অংশগ্রহণকারীরা বিব্রতকর কোনো ছবিসংবলিত টিশার্ট পরে থাকলে তা অন্যরা কতটা লক্ষ্য করবে বা মনে রাখবে, তা তারা বাস্তবের তুলনায় অনেক বেশি অনুমান করেছিলেন। একইভাবে দলীয় আলোচনায় নিজেদের বলা কথা অন্যদের কাছে কতটা প্রকট মনে হয়েছে, তাও তারা বাড়িয়ে ধরে নিয়েছিলেন।

গবেষকদের ব্যাখ্যায়, এই প্রবণতার পেছনে কাজ করে একধরনের অ্যাংকরিংঅ্যাডজাস্টমেন্ট প্রক্রিয়া, অর্থাৎ মানুষ নিজের সমৃদ্ধ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে অনুমান শুরু করে, তারপর অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় নিয়ে সেই অনুমান সংশোধন করে, কিন্তু এই সংশোধন সবসময় যথেষ্ট হয় না। ফলে যে মুহূর্তটি নিজের চোখে অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ ও লজ্জাজনক মনে হয়, বাস্তবে উপস্থিত অন্য মানুষেরা প্রায় নিশ্চিতভাবেই তা এগিয়ে গিয়ে ভুলে গেছেন।

পরেরবার যখন মস্তিষ্ক হঠাৎ কোনো পুরোনো অস্বস্তিকর মুহূর্ত সামনে এনে হাজির করবে, তখন মনে রাখা ভালো, এটি কোনো সমস্যার লক্ষণ নয়। এটি স্রেফ একটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মানব মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালী, যা যা ভীতিকর মনে হয়েছিল তা আঁকড়ে ধরে রাখে, ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে, এবং একইসঙ্গে সেই মুহূর্তে অন্যরা আসলে কতটা মনোযোগ দিয়েছিল তা কিছুটা বাড়িয়ে অনুমান করে।

লাইফস্টাইল থেকে আরো পড়ুন