লাইফস্টাইল

ফ্লোটার ফ্রেন্ড বা ভাসমান বন্ধুত্ব: সবার পরিচিত, কারও ঘনিষ্ঠ নন?

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ ০৪:০৮

ছবি: সংগৃহীত

চারপাশে অনেক পরিচিত মানুষ, নিয়মিত আড্ডা, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য বন্ধু। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে সামাজিক জীবন বেশ প্রাণবন্ত। অথচ প্রয়োজনের সময় ফোন করার মতো একজন মানুষও নেই। সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার মতো ঘনিষ্ঠ বন্ধুও যেন খুঁজে পাওয়া যায় না।

মনোবিজ্ঞানীরা এই ধরনের মানুষকে বলেন ‘ফ্লোটার ফ্রেন্ড’ (Floater Friend) বা ভাসমান বন্ধু। তারা অনেক বন্ধুমহলে পরিচিত হলেও, কোনো একটি গোষ্ঠীর খুব কাছের মানুষ হয়ে উঠতে পারেন না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো মানসিক রোগ বা ব্যক্তিত্বের দুর্বলতা নয়। বরং আধুনিক জীবনযাপন, ব্যস্ততা, সামাজিক যোগাযোগের ধরন এবং জীবনের নানা পরিবর্তনের কারণে অনেকেই অজান্তেই এই অবস্থায় চলে যান।

কী এই ‘ভাসমান বন্ধু’?

মার্কিন মনোবিজ্ঞানী ডা. লরেন মাহোনি-র ভাষায়, ভাসমান বন্ধু এমন একজন ব্যক্তি, যিনি বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীতে সহজেই মিশতে পারেন, কিন্তু কোথাও স্থায়ীভাবে নিজের জায়গা তৈরি করতে পারেন না।

তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরিচিত মুখ হলেও, খুব কম মানুষই তাকে নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধু হিসেবে ভাবেন।

ফলে সামাজিকভাবে ব্যস্ত দেখালেও ভেতরে ভেতরে তৈরি হয় এক ধরনের নিঃসঙ্গতা।

পরিচিত মানুষ বেশি মানেই গভীর বন্ধুত্ব নয়

সমাজকর্মী ও সম্পর্কবিশেষজ্ঞ মেগান গোল্ডবার্গ বলেন, ভাসমান বন্ধুদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সম্পর্কের সংখ্যা বেশি হলেও গভীরতা কম।

অনেক সময় আড্ডায় গিয়ে দেখা যায়, অন্যরা পুরোনো স্মৃতি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা নিজেদের ভেতরের রসিকতা নিয়ে কথা বলছেন। অথচ সেই আলোচনায় নিজের অংশগ্রহণের সুযোগ খুব কম থাকে। তখনই তৈরি হয় ‘আমি যেন বাইরের মানুষ’ অনুভূতি।

কেন এমন হয়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, নানা কারণেই একজন মানুষ ধীরে ধীরে ভাসমান বন্ধুর অবস্থায় চলে যেতে পারেন।

এর মধ্যে রয়েছে—

নতুন শহর বা দেশে চলে যাওয়া চাকরি বা পড়াশোনার কারণে পুরোনো বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যাওয়া সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া পরিবার ও কাজের অতিরিক্ত ব্যস্ততা মানসিক চাপ বা বিষণ্নতা নতুন সম্পর্কে নিজেকে উন্মুক্ত করতে দ্বিধা

অনেক সময় মানুষ নিজেও বুঝতে পারেন না যে তার আচরণ অন্যদের কাছে দূরত্ব তৈরি করছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কি দায়ী?

বন্ধুত্ববিষয়ক গবেষক ক্রিস্টি ফেরারি মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধুত্বের ধারণাকেই বদলে দিয়েছে।

আগে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত দেখা করা, একসঙ্গে সময় কাটানো কিংবা দীর্ঘ আলাপের প্রয়োজন হতো।

এখন জন্মদিনের শুভেচ্ছা, একটি ‘লাইক’ বা কোনো ছবিতে মন্তব্য করেই অনেকে মনে করেন সম্পর্ক বজায় আছে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনলাইনের যোগাযোগ কখনোই গভীর মানবিক সম্পর্কের বিকল্প হতে পারে না।

ভাসমান বন্ধু হওয়ার ইতিবাচক দিকও আছে

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের মানুষের কিছু শক্তিশালী সামাজিক দক্ষতাও থাকে।

তারা সাধারণত—

নতুন পরিবেশে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেন সহজে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করতে পারেন কর্মক্ষেত্র বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দ্রুত সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হন

এই দক্ষতাগুলো পেশাগত ও সামাজিক জীবনে অনেক সময় বড় সুবিধা এনে দেয়।

তবুও কেন একাকিত্ব বাড়ে?

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের জীবনে এমন কিছু সম্পর্ক প্রয়োজন, যেখানে সে নিজেকে নিরাপদ, গুরুত্বপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য মনে করবে।

নিয়মিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বা অসংখ্য পরিচিত মানুষ থাকা সত্ত্বেও যদি মনে হয়—

অসুস্থ হলে কে খোঁজ নেবে? মন খারাপ বুঝবে কে? সাফল্যে সত্যিকারের আনন্দ করবে কে?

তাহলে বুঝতে হবে সম্পর্কের গভীরতায় ঘাটতি রয়েছে।

কীভাবে গড়ে তুলবেন গভীর বন্ধুত্ব?

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—

✔ সংখ্যার চেয়ে গুরুত্ব দিন মানসম্পন্ন সম্পর্কে

অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচিত থাকার চেয়ে একজন বা দুজনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি করা বেশি মূল্যবান।

✔ নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন

শুধু প্রয়োজনেই নয়, মাঝে মাঝে খোঁজ নিন, আগের আলাপের বিষয় মনে রেখে আবার কথা বলুন।

✔ সময় দিন

বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে একসঙ্গে সময় কাটানোর মাধ্যমে। কফি, হাঁটা বা ছোট আড্ডাও সম্পর্ককে গভীর করতে পারে।

✔ নিজের অনুভূতি প্রকাশ করুন

সব সময় হাসিখুশি মুখ দেখানোর বদলে প্রয়োজন হলে নিজের দুর্বলতা ও অনুভূতির কথাও ভাগ করে নিন। এতে বিশ্বাস তৈরি হয়।

✔ অন্যের কথাও মন দিয়ে শুনুন

ভালো বন্ধু হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং প্রয়োজনের সময় পাশে থাকা।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অনেক পরিচিত মানুষ থাকার চেয়ে একজন বিশ্বস্ত বন্ধু জীবনের জন্য অনেক বেশি মূল্যবান।

বন্ধুত্ব কোনো প্রতিযোগিতা নয়। এটি সময়, বিশ্বাস, আন্তরিকতা এবং নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তৈরি হয়। তাই যদি নিজেকে ‘ভাসমান বন্ধু’ মনে হয়, হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ছোট ছোট উদ্যোগই একটি সাধারণ পরিচয়কে গভীর বন্ধুত্বে রূপ দিতে পারে।

সূত্র: Real Simple, Psychology Today, American Psychological Association (APA), Verywell Mind।

লাইফস্টাইল থেকে আরো পড়ুন