সোশ্যাল মিডিয়া

শিশুদের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের দায়ে টিকটককে ৪০ কোটি ডলার জরিমানা যুক্তরাষ্ট্রের

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ ১৫:৪৬

১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও গোপনীয়তার আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৪০ কোটি ডলারের সমঝোতায় পৌঁছেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটক ও এর মূল প্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্স। শিশুদের অনলাইন গোপনীয়তা সুরক্ষার আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে এটি অন্যতম বড় আর্থিক সমঝোতা।

মার্কিন বিচার বিভাগ শুক্রবার (২১ আগস্ট) এই সমঝোতার ঘোষণা দেয়। চুক্তি অনুযায়ী, টিকটক ও বাইটড্যান্স তাৎক্ষণিকভাবে ৩০ কোটি ডলার পরিশোধ করবে। এরপর ২০১৯ সালে টিকটকের পূর্বসূরি প্রতিষ্ঠান মিউজিক্যালি-র সঙ্গে করা একটি পুরোনো আইনি সমঝোতা বাতিলের পর আরও ১০ কোটি ডলার দিতে হবে।

মার্কিন সরকারের অভিযোগ ছিল, টিকটক দীর্ঘ সময় ধরে ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেছে, অথচ তাদের বাবা-মায়ের প্রয়োজনীয় সম্মতি নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের চিলড্রেনস অনলাইন প্রাইভেসি প্রটেকশন অ্যাক্ট বা কপা অনুযায়ী, ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের আগে অভিভাবকের সম্মতি নেওয়া বাধ্যতামূলক।

২০২৪ সালে মার্কিন বিচার বিভাগ ও ফেডারেল ট্রেড কমিশন টিকটক, বাইটড্যান্স ও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলায় অভিযোগ করা হয়, ২০১৯ সালের পরও টিকটক ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের নিয়মিত অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ দিয়েছে। এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে শিশুদের ভিডিও দেখা, তৈরি করা এবং অন্য ব্যবহারকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ ছিল।

মার্কিন সরকারের অভিযোগ অনুযায়ী, এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে শিশুদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হয়েছে। এমনকি শিশুদের জন্য তৈরি বিশেষ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও ই-মেইল ঠিকানা ও অন্যান্য তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ ওঠে।

অভিভাবকরা তাদের সন্তানের অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করে সেটি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য মুছে ফেলার অনুরোধ করার পরও অনেক ক্ষেত্রে টিকটক যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করা হয়। শিশুদের অ্যাকাউন্ট শনাক্ত এবং মুছে ফেলার ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট কার্যকর ছিল না বলে মামলায় দাবি করা হয়েছিল।

তবে এই সমঝোতার মাধ্যমে টিকটক ও বাইটড্যান্স আদালতে সব অভিযোগ স্বীকার করেছে এমন নয়। সমঝোতাটি মূলত দীর্ঘ আইনি বিরোধ নিষ্পত্তির একটি প্রক্রিয়া।

মার্কিন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ব্রেট শুমেট বলেছেন, শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই আইন মেনে চলতে হবে। বিচার বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, মামলা দায়েরের পর টিকটকের মালিকানা কাঠামো, গোপনীয়তা নীতি এবং তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।

শিশুদের গোপনীয়তা নিয়ে টিকটকের বিরুদ্ধে এর আগেও যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ২০১৯ সালে টিকটকের পূর্বসূরি মিউজিক্যালি-র বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগে ৫৭ লাখ ডলারের সমঝোতা হয়েছিল। তখন ১৩ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতি নিশ্চিত করা এবং শিশুদের তথ্য সুরক্ষায় নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

এরপরও একই ধরনের অভিযোগ ওঠায় ২০২৪ সালে নতুন করে মামলা করে মার্কিন সরকার। মামলায় বলা হয়েছিল, আগের আইনি নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও টিকটক শিশুদের তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

শিশুদের অনলাইন গোপনীয়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে টিকটক ছাড়াও অন্যান্য বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইনি চাপের মুখে রয়েছে। একই আইনের আওতায় ইউটিউব ২০১৯ সালে ১৭ কোটি ডলার এবং এপিক গেমস ২০২২ সালে ২৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সমঝোতায় গিয়েছিল।

এদিকে শিশু ও কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নিরাপত্তা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রে বড় ধরনের আইনি লড়াই চলছে। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার বিরুদ্ধেও একাধিক অঙ্গরাজ্য মামলা করেছে। এসব মামলায় শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ এবং তরুণ ব্যবহারকারীদের প্ল্যাটফর্মে আকৃষ্ট করার বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে অভিযোগ রয়েছে।

টিকটকের বিরুদ্ধে এই ৪০ কোটি ডলারের সমঝোতা এমন এক সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা, তথ্য নিরাপত্তা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। একই সঙ্গে বাইটড্যান্সের কাছ থেকে টিকটকের মার্কিন ব্যবসা আলাদা করার প্রক্রিয়াও এগিয়েছে।

সমঝোতার মাধ্যমে টিকটকের বিরুদ্ধে শিশুদের গোপনীয়তা রক্ষায় আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির বয়স যাচাই, শিশুদের অ্যাকাউন্ট শনাক্তকরণ এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার ওপর নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়া থেকে আরো পড়ুন