তীব্র গরমের মধ্যে জ্বালানি সংকটে সারাদেশে দিনে-রাতে দফায় দফায় লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন। গ্রামাঞ্চলে কোথাও কোথাও ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না, যার প্রভাব পড়ছে কৃষি, ব্যবসা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে।
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ ০৩:২৫
লোডশেডিং শিক্ষার্থীদের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে
দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিতরণ কোম্পানিগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গড়ে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ১১ আগস্ট রাত থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত ২১ ঘণ্টার হিসাবে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াট ঘাটতি রেকর্ড হয়েছে রাত ১২টায়, যখন চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৫২৩ মেগাওয়াট আর সরবরাহ করা গেছে মাত্র ১৩ হাজার ৯৩১ মেগাওয়াট।
এর আগে রাত ৯টায় দিনের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার ৪৩ মেগাওয়াট রেকর্ড হয়, যার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৫ হাজার ৩৬ মেগাওয়াট—অর্থাৎ ঘাটতি ৩ হাজার ৭ মেগাওয়াট। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘাটতি আরও বাড়ে; রাত ১টা ও ২টায় তা ছিল যথাক্রমে ৩ হাজার ১৯৪ ও ৩ হাজার ১১৬ মেগাওয়াট। সকালে কিছুটা উন্নতি হলেও দুপুর ও বিকেলে ঘাটতি আবার ২ হাজার ৬৮৮ থেকে ৩ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াট পর্যন্ত ওঠানামা করে।
তথ্য বলছে, বছরের শুরুতে চিত্রটি ছিল একেবারে ভিন্ন। ১ জানুয়ারি দিনের পিক আওয়ারে চাহিদা ছিল মাত্র ৯ হাজার ২৭০ মেগাওয়াট এবং রাতে ৯ হাজার ৮৬৫ মেগাওয়াট—সেদিন কোনো লোডশেডিং হয়নি। সাধারণত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সরবরাহ চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। কিন্তু এপ্রিল থেকে গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে, মে-জুনে নিয়মিত লোডশেডিং হয়, জুলাইয়ে কিছুটা কমলেও আগস্টে তা আবার বেড়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, ঘাটতির মূল কারণ গ্যাস সরবরাহের সংকট। প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় একাধিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহ-ব্যয়ের চাপ এবং দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট স্থাপিত সক্ষমতা যথেষ্ট থাকলেও চাহিদার মুহূর্তে তার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়াতেই লোডশেডিং বেড়েছে। তিনি জানান, সন্ধ্যা নাগাদ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে, তবে সংকট পুরোপুরি কবে কাটবে তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। গ্রীষ্মেই সংকট শুরু হওয়ায় মানুষের ভোগান্তির জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বি. ডি. রহমত উল্লাহ বলেন, জ্বালানি সংকট তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়, এটি কাটলে তবেই বিদ্যুৎ সংকট কাটতে শুরু করবে। তিনি ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও রুফটপ সোলারের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন।
শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের চিত্র আরও ভয়াবহ। কিছু এলাকায় দিনের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সময়ই বিদ্যুৎ থাকছে না। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে দিন-রাত মিলিয়ে ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের এক দিনমজুর জানান, সারারাত বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে ঘুমাতে না পেরে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, যার প্রভাব পড়ে পরদিনের কাজে। স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ফ্রিজে রাখা পচনশীল পণ্য নষ্ট হয়ে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে। কালীগঞ্জ নেসকো পিএলসির নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, এলাকাটির চাহিদা প্রায় ১৬ মেগাওয়াট হলেও জাতীয় গ্রিড থেকে মিলছে মাত্র ৭ থেকে ৮ মেগাওয়াট।
ফেনীর দাগনভূঞায় সরকারি শিডিউল অনুযায়ী লোডশেডিং হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয় গ্রাহকদের। প্রতিদিন এলাকাটিতে ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা, কোথাও কোথাও ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। আরইবির ফেনী সমিতি জানিয়েছে, তারা চাহিদার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ পাচ্ছে, ফলে নির্ধারিত সময়সূচি মেনে চলা সম্ভব হচ্ছে না। মাদারীপুরেও দিন-রাত মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে, সবচেয়ে বেশি ভুগছেন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রাহকরা।
ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) প্রায় ৪০ হাজার গ্রাহকের ১৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলছে মাত্র ১১ মেগাওয়াট। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ৪ লাখ ২৩ হাজার গ্রাহকের ১০৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৫২ মেগাওয়াট। ১৪টি সাবস্টেশনের মাধ্যমে গুরুত্ব বিবেচনা করে লোডশেডিং ভাগ করা হচ্ছে বলে বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাতেও। মোমবাতি বা কুপির আলোয় তীব্র গরমে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় এক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী, যার সামনে টেস্ট পরীক্ষা। একটি প্রেসের মালিক জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় কাজ করতে না পারায় গ্রাহকদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে এবং আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা। কারখানাগুলোর উৎপাদনও নেমে গেছে প্রায় অর্ধেকে, শ্রমিকরা কাটাচ্ছেন অলস সময়।
ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক (পিঅ্যান্ডডি) মো. রোকনুজ্জামান জানান, তাদের আওতাধীন ২১ জেলা ও ২২ উপজেলা শহরের প্রায় ১৮ লাখ গ্রাহকের ৭০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ১০০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়েছে। তিনি বলেন, বরাদ্দ অনুযায়ীই সরবরাহ চালানো হচ্ছে এবং এলাকায় ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ থেকে সুরক্ষার জন্য তারা সরকারের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে চিঠিও দিয়েছেন।
দীর্ঘ ও অনিয়মিত লোডশেডিংয়ের জেরে কিছু এলাকায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে পুলিশ মহাপরিদর্শককে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি প্রায় চার কোটি গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে, কিন্তু চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিং করতে বাধ্য হচ্ছে সমিতিগুলো, যার ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। সংগঠনটি প্রতিটি সমিতির আওতাধীন গ্রিড, উপকেন্দ্র ও অফিসে নিরাপত্তা জোরদারের অনুরোধ জানিয়েছে এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
পিজিসিবির হিসাব অনুযায়ী, ১২ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৩১৯ মেগাওয়াট, যেখানে আগের দিন একই সময়ে তা ছিল ২ হাজার ৪৯৯ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পিক আওয়ারে তেলচালিত কেন্দ্র সচল রাখায় সাময়িকভাবে ঘাটতি কমে, কিন্তু রাতে সেসব কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেলে লোডশেডিং আবার দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিং পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান অনিশ্চিত বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা, আর ভুক্তভোগী মানুষ তাকিয়ে আছেন কবে দুর্ভোগের অবসান হবে সেদিকে।
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন