বিশ্ব

সৌদি আরবকে পারমাণবিক শক্তিধর করছে আমেরিকা

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ ০৩:৩১

???? ট্রাম্পের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত: সৌদি আরবকে পারমাণবিক শক্তিধর করছে আমেরিকা

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন মোড় নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব একটি ঐতিহাসিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন — এই চুক্তি কি মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার দরজা খুলে দেবে?

চুক্তি কী নিয়ে

মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট এবং সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুলাজিজ বিন সালমান দুটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন — একটি "শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি" এবং একটি "দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা চুক্তি"। এর আওতায় মার্কিন কোম্পানিগুলো সৌদি আরবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনা করবে। মার্কিন জ্বালানি বিভাগ বলছে, এটি "কয়েক দশকব্যাপী কোটি কোটি ডলারের অংশীদারিত্বের আইনি ভিত্তি।"

যে কারণে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ

চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো — সৌদি আরবকে নিজের মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। এর আগে ২০০৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে চুক্তিতে এই অনুমতি ছিল না এবং কঠোর আন্তর্জাতিক পরিদর্শনও ছিল। সেই চুক্তিকেই বিশেষজ্ঞরা "গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড" বলেন। এবার সেই মানদণ্ড শিথিল হচ্ছে।

মিডল ইস্ট বিশেষজ্ঞ রোজমেরি কেলানিক বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র এর আগে কখনো অন্য কোনো দেশকে নিজের মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে সাহায্য করেনি। এটা সত্যিই চমকপ্রদ।"

সৌদি আরব পারমাণবিক বিদ্যুৎ চাইছে কেন

সৌদি আরব বছরে ৪৫৩ টেরাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, যার ৬২% আসে গ্যাস থেকে এবং ৩৮% তেল থেকে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি মাত্র ১%-এরও কম। নিজস্ব তেল ও গ্যাস বিদ্যুৎ উৎপাদনে না খরচ করে রপ্তানি করতে পারলে বিশাল অর্থনৈতিক সুবিধা হবে। বর্তমানে দেশটির কোনো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নেই।

ট্রাম্প কেন এই চুক্তি করলেন

বিশ্লেষকরা বলছেন দুটি কারণ মূল ভূমিকা রেখেছে। প্রথমত, মার্কিন কোম্পানিগুলোর বিশাল বাণিজ্যিক স্বার্থ। দ্বিতীয়ত, রাশিয়া ও চীন আগে থেকেই সৌদি আরবকে পারমাণবিক প্রযুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে থাকলে সৌদি আরব চীনের দিকে ঝুঁকত।

পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ফ্রাঙ্ক গার্ডনার বলছেন, সৌদি আরব নিজে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে শুরু করলে ইরানের কট্টরপন্থীরা গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরির দিকে ঝুঁকতে পারে। এরপর মিশর ও তুরস্কও একই পথে যেতে পারে — শুরু হতে পারে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নিজের কথা। তিনি আগেই বলেছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র পেলে সৌদি আরবও একই পথে হাঁটবে।

ইসরায়েল ও আমেরিকায় বিভক্ত মত

ইসরায়েলের অর্থনীতিমন্ত্রী বলেছেন শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে হলে "সামলানো যাবে।" তবে সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগডর লিবারম্যান হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, "এটি শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্রে পরিণত হবে।"

মার্কিন কংগ্রেসেও বিভক্তি স্পষ্ট। ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জন গ্যারামেন্ডি বলেছেন, "এটি ভয়াবহ নীতি — সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থেকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা যায়।" তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, কংগ্রেসে বিরোধীরা এই চুক্তি ঠেকানোর মতো যথেষ্ট ভোট পাবেন না।

দীর্ঘ আলোচনার পরিণতি

এই আলোচনা শুরু হয়েছিল ২০০৮ সালে বুশ প্রশাসনের আমলে। বাইডেনও চেষ্টা করেছিলেন, তবে সেটা ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিককরণের শর্তে আটকে ছিল। ট্রাম্প সেই শর্ত বাদ দিয়েই চুক্তি চূড়ান্ত করেছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয় — এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামোয় একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা, যার প্রভাব আগামী দশকগুলোতে অনুভূত হবে।

বিশ্ব থেকে আরো পড়ুন