প্রবাস

ইরানে আগ্রাসন

মধ্যপ্রাচ্যে কাজ হারানোর শঙ্কায় বহু প্রবাসী

প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ০২:৫৭

আরব আমিরাতের ফুজাইরা তেলক্ষেত্রে হামলায় আগুন ও ধোঁয়া। ছবি: রয়টার্স

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার শাহেদ হোসেন দুই বছর আগে কাতার গিয়েছিলেন, নিজের চেষ্টায় কাজও পেয়েছেন দোহার একটি রেস্তোরাঁয়। কিন্তু, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ তার প্রবাসজীবন এলোমেলো করে দিয়েছে।

তিনি বলছিলেন, “এখানের অবস্থা মোটেই ভালো না৷ রেস্টুরেন্টে পর্যটক নেই বললেই চলে। ড্রোন আর মিসাইল হামলা শুরুর পর বিপুল সংখ্যক পর্যটক কাতার ছেড়ে চলে গেছেন। যে রেস্টুরেন্টে কাজ করি, এখানে যেসব ফাস্টফুড তৈরি হয় সেগুলোর উপকরণের সরবরাহেও টান পড়েছে।”

সেখানে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় হতাশা প্রকাশ করে শাহেদ বলেন, সব খাবারের দাম বেড়ে গেছে। আগে যে পেঁয়াজ কিনতেন ১-২ রিয়াল কেজিতে, সেটা দুই তিনগুণ বেড়ে ৫-৬ রিয়াল হয়ে গেছে। একইভাবে ১ রিয়াল কেজি দরের আলু হয়ে গেছে ৪ থেকে ৫ রিয়াল। তেল কিনতেন লিটার ৯-১০ রিয়াল করে, সেই তেল কিনতে হচ্ছে ১৭ থেকে ১৮ রিয়াল দিয়ে।


তিনি বলেন, “কিছু কম দামে পাওয়ার আশায় আমরা বেশকিছু সুপারমার্কেটে ঘুরে-ঘুরে কিনি। কিন্তু সব সুপারমার্কেটে একই দাম। বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়ে গেছে।”

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে প্রবাসীরা যে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন, তা তুলে ধরে শাহেদ বলেন, “এখানে আমাদের যে স্বাভাবিক জীবন ছিল, যুদ্ধ শুরুর পর তা পুরো এলোমেলো হয়ে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করছে। কাজ নেই। আমরাও শঙ্কায় আছি।

“বেতন চাইতে পারি না, কারণ আমরা নিজেরাই দেখতে পাচ্ছি মালিকের বিক্রি কমে গেছে। শত-শত বাংলাদেশি প্রবাসী এক ধরনের অনিশ্চয়তা নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন এখানে।”

চাঁদপুরের শাহরাস্তি এলাকার নাসির উদ্দীন থাকেন কুয়েতের রাজধানী কুয়েত সিটিতে, কাজ করেন সেখানকার একটি অ্যালুমিনিয়াম কারখানায়।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এতদিন যা-ই কাজকাম ছিল, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর একদম কাজ নেই। এখানে একদিনও মিসাইল আক্রমণ বন্ধ ছিল না। অবিরাম মিসাইল, ড্রোন হামলা হয়েছে।

“আমার সামনে ইকামা করতে হবে, নাহলে অবৈধ হয়ে যাব। ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার মতো লাগবে। সব মিলিয়ে মারাত্মক মানসিক টেনশনে আছি।”

নাসির বলছিলেন, যুদ্ধবিরতির পর এই কয়েকদিন হামলা না হলেও তাদের মনে ভয় আর আতঙ্ক। অনেক লোক সেখানে কাজবিহীন অবস্থায় আছে। অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যও বেড়ে গেছে। তবে যুদ্ধবিরতির পর ধীরে-ধীরে কিছু জিনিসের দাম কমছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা কুমিল্লার চান্দিনার একজন কাজ করেন দুবাইয়ের একটি পাঁচ-তারকা হোটেলে। কোম্পানির কড়াকড়ির কারণে তিনি নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চান না।

এই প্রবাসী বলেন, “সার্বক্ষণিক একটা ভয় ঢুকে গেছে মনে। যুদ্ধবিরতির আগ পর্যন্ত প্রতিদিন ড্রোন, মিসাইল হামলা হয়েছে। হামলার আগে এখানে ফোনে সতর্কতামূলক বার্তা পাঠায়। এখন খালি মনে হচ্ছে, একটু পরেই বুঝি হামলা হবে। রীতিমতো ‘ট্রমাটাইজড’ হয়ে গেছি।”

যুদ্ধের কারণে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কথা বলেছেন তিনি।

এই প্রবাসী বলছিলেন, “হোটেলে কোনো পর্যটক নেই। অথচ, আগে আমরা গাওয়া (এক ধরনের পানীয়) ‘সার্ভ’ করে কূল পেতাম না। কিছু কিছু জিনিসের দাম অনেক দাম বেড়ে গেছে। ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি।”

মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ বাহরাইনের মানামায় থাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের সাইফুল ইসলাম সম্প্রতি কাজ হারিয়েছেন।

সাইফুল বলেন, “বাহরাইনের মার্কিন ঘাঁটির বেশ কাছাকাছি থাকতাম আমরা পাঁচজন বাংলাদেশি। এখানে ঘাঁটিতে হামলার পর সব কিছু বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

“আমি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতাম, একটা সুপারমার্কেট, তারা বলেছে আগামী মাস থেকে কাজ দেখতে। বিরাট টেনশনে আছে। সরকারিভাবে যদি বাহরাইন সরকারের সঙ্গে আলাপ করে একটা ব্যবস্থা হতো, ভালো হতো।”

সৌদি আরবের রিয়াদে থাকেন ঢাকার খিলক্ষেত এলাকার বাসিন্দা সাখাওয়াত হোসেন। তার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর সদরের রঘুনাথপুর গ্রামে। তিনি বলছিলেন, যুদ্ধ শুরুর পর দেশটিতে কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ-আদা রসুনের মতো আমদানিনির্ভর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে গেছে।

সাখাওয়াত বলেন, “সবচেয়ে বড়ো প্রভাব পড়েছে পর্যটনে। কোনো পর্যটক নেই। ফলে, পর্যটননির্ভর কর্মীরা আছেন চূড়ান্ত হতাশায়।”

সৌদি আরবে ‘ইভেন্ট মার্কেটিং’ সম্পর্কিত কাজে যুক্ত এই প্রবাসী বলেন, “আগে এখানে বড় বড় ব্যবসায়িক ইভেন্টগুলো হতো। যুদ্ধ শুরুর পর সব বাতিল বা স্থগিত হয়ে গেছে। ফলে, কাজ কমে গেছে।

“এছাড়া, বিদেশ থেকে আসা ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্বরা হিলটন, হলিডে ইনের মতো হোটেলে উঠতেন, সেখানকার অনেক কর্মীর ২৫ শতাংশের মতো বেতন ছাঁটাইয়ের কথা শোনা গেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, বিদেশি আয়োজকরা না আসায়, তাদের আয় কমে গেছে। এসব ইভেন্ট ঘিরে যারা কাজ করতেন, তাদের একটা বড় অংশেরই হাতে তেমন কাজ নেই।”

সৌদি আরবের রিয়াদে থাকা কুমিল্লার দেবিদ্বারের ইউশা খান কাজ করেন সেখানকার একটি বিদেশি রেস্তোরাঁয়। তিনি বলেন, একটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি ওই রেস্তোরাঁয় কাজ পেয়েছেন। বেতন পাচ্ছেন ১২০০ রিয়াল, আগে ২৫০ রিয়ালের মধ্যেই মোটামুটি পুরো মাসের খাবারের খরচ হয়ে যেত। এখন লাগছে ৩৫০ রিয়াল।

এ ১০০ রিয়াল খরচ বাড়লেও তার বেতন বাড়েনি, এ কথা তুলে ধরে ইউশা বলেন, “এই টাকার মধ্যে এখানে থাকা-খাওয়া ছাড়াও অন্যান্য ব্যয় মেটানোর পর হাতে কয়টা টাকাই বা থাকে।”

তিনি বলছেন, সৌদি আরবের সব খাতে যুদ্ধের প্রভাব পড়েনি। বাজারে সব জিনিসের দাম না বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ বেশকিছু পণ্যের দাম বেড়েছে।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে পেঁয়াজ প্রতি কেজি সর্বোচ্চ ১ রিয়াল থেকে ১ দশমিক ৭৫ রিয়ালে পাওয়া গেলেও সেটি বেড়ে এখন ২ দশমিক ৫ রিয়ালে ঠেকেছে, কাঁচা মরিচের কেজি আগে ছিল সর্বোচ্চ ৮ থেকে ১০ রিয়ালের মধ্যে; এখন সেটি ২৫ রিয়াল, আগে বেগুন ২ রিয়ালে মিললেও এখন গুনতে হচ্ছে ৭ থেকে ৮ রিয়াল। সাধারণ মানের এক কেজি আপেল পাওয়া যেত ৫ থেকে ৭ রিয়ালে, এখন গুনতে হচ্ছে ১০ রিয়াল।

গেল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথভাবে হামলা করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হন। বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা আলি খামেনিও গুরুতর আহত হয়েছেন বলে খবর এসেছে।

হামলার জবাবে কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সৌদি আরব ও ওমানে হামলা চালায় ইরান। এসব দেশের মধ্যে ওমান ও সৌদি আরবে কম হামলা চালালেও কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালায় ইরান।

ইরানের পাল্টা হামলায় বিভিন্ন দেশে মারা যান বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি প্রবাসী। এদের মধ্যে অন্তত ছয়জনের লাশ এ পর্যন্ত দেশে এসেছে।

রেমিটেন্সে টান পড়ার শঙ্কা

গেল মার্চে ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেমিটেন্স এসেছে। সে মাসে পৌনে ৪ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) এসেছে ২৬ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, একই সময়ে মোট রেমিটেন্সের মধ্যে উপসাগরীয় ছয়টি দেশ (সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, আরব আমিরাত, বাহরাইন, ওমান) থেকে এসেছে ১০ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, মার্চের প্রথম ২৩ দিনে রেমিটেন্স এসেছিল ২ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার। আর চলতি মাসের এপ্রিলের ২২ তারিখ পর্যন্ত দেশে এসেছে ২ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার।

সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, আগামী মাসগুলোতে এই ধারা বিঘ্নিত হতে পারে। তারা বলছেন, এই টাকা ছিল অধিকাংশ প্রবাসীদের সঞ্চয় থেকে পাঠানো। কেননা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যেখানে বেতন আটকা, সেখানে রেমিটেন্স বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ এটাই।

বেসরকারি সংস্থা অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ) কাজ করে প্রবাসীদের নিয়ে। সংস্থাটির চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বেতন না পাওয়ার সমস্যা নিয়ে অন্তত ২০০ জন প্রবাসী তাদের কাছে রেজিস্ট্রেশন করেছেন।

“তাদের হয়তো কারো কাছে কিছু টাকা ছিল, যেটা দেশে পাঠায় নাই, সেটা তারা খরচ করছে। আবার কিছু আছে যে দেশেও হয়তো তাদের কিছু সঞ্চয় ছিল সেই জায়গাগুলো থেকে খরচ করছে। এখন এটা দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে যদি আগামী মাসগুলো বা এই মাস শেষে যদি তারা বেতন না পায়, তাহলে তারা কিন্তু ঋণের মধ্যে চলে যাবে।”

এ ছাড়া যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে খরচ বাড়ায় প্রবাসীদের আয় থেকে সাশ্রয় করার পরিমাণও কমবে, যার প্রভাব পড়তে পারে রেমিটেন্সে।

বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের বড় অংশ কাজ করে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনে। এই ছয়টি দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি রয়েছে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, এই ছয়টি দেশে বর্তমানে ৬০ লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করছেন।

বিএমইটির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে এই দেশগুলোতে শ্রমিক গেছেন ৯ লাখ ১৯ হাজার ৪৩৫ জন। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে কাজের উদ্দেশ্যে এই ছয়টি দেশে গেছেন ৩২ লাখ ৮ হাজার ৮৮ জন।

দরকার নানামুখী সহযোগিতা

ওকাপ চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা তো নিয়মিত খোঁজখবর রাখি। আমাদের ওকাপের একটা নেটওয়ার্ক আছে সব দেশে। আসলে যেটা হচ্ছে যে, কর্মীরা এখন অনেক আতঙ্কের মধ্যে আছে। কারণ হল, এই যুদ্ধের কারণে এখন সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। এটার প্রভাব তো কর্মীদের ওপর পড়ছে।”

তিনি বলেন, “আর অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে যে কাজও কমে যাচ্ছে। অনেক কর্মী আমাদের ফোন করছে যে, তারা কাজ হারাচ্ছে। আবার অনেক জায়গায় বেতনও ঠিকমতো দিচ্ছে না। তো এইটা আসলে একটা বড় সংকটের দিকে যাচ্ছে।”

শাকিরুল বলেন, “আমরা তো সরকারকে বারবার বলছি যে, আমাদের দূতাবাসগুলোকে এখন আরও ‘প্রো-অ্যাকটিভ’ হতে হবে। কর্মীদের পাশে দাঁড়াতে হবে। বিশেষ করে যারা কাজ হারাচ্ছে, তাদের জন্য বিকল্প কাজের ব্যবস্থা করা অথবা তাদের দেশে ফেরত আনার যদি প্রয়োজন হয়, সেই ব্যবস্থা করা। আর আমাদের ওকাপ থেকেও আমরা একটা হটলাইন চালু রাখছি কর্মীদের জন্য। তারা যেকোনো সমস্যায় আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে।”

প্রবাসীদের জন্য বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে স্বল্পসুদে ঋণ দেয় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। সেই উদ্যোগকে কাজ হারানো কর্মীদের জন্যও কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন শাকিরুল।

বিভিন্ন দেশে কিছু মানুষের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন তুলে ধরে ওকাপ চেয়ারপারসন বলেন, “তারা আমাকে বলেছেন যে আপনারা একটা কাজ করেন, সরকারের কাছে বলেন যে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার জন্য আমার ফ্যামিলিগুলাতে। যাতে তারা চলতে পারে।”

সরকারের করণীয় নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “তাদের তো করণীয় সবচেয়ে বেশি। তারা বলছে যে, তারা খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে বা ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এটা আসলে অভিবাসী শ্রমিকদের যে চাহিদা আছে, সেটা পূরণ করে না।”

ইসরায়েলের হামলায় লণ্ডভণ্ড লেবাননের উদাহরণ টেনে শাকিরুল বলেন, “লেবাননে আসলে খুবই করুণ অবস্থা বাংলাদেশি প্রবাসীদের। বেশিরভাগ মানুষ যারা লেবাননের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ছিল, তারা সবাই কাজ বাদ দিয়ে, কাজ হারিয়ে বৈরুতে চলে গেছে। কিন্তু বৈরুতেও আক্রমণ হয়েছে।

“এবং সেখানে তারা যে ‘শেল্টারে’ থাকে, সেগুলো হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে। সেখানে বিভিন্ন সংস্থা বিভিন্নভাবে সহায়তা দেয়। বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকেও হয়ত তাদেরকে কিছু খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু, সেখানকার কর্মীরা বলেছেন, এটা আসলে পর্যাপ্ত নয়।”

ঠিক একইভাবে অন্য দেশ যেমন-কুয়েত, সৌদি আরব, বাহরাইন যেখানে আক্রমণ হয়েছে, সবগুলো জায়গাতে দূতাবাস এবং সরকারের পর্যাপ্ত সহযোগিতা করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

অভিবাসন ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “করোনার সময়ও একই ধরনের সংকট তৈরি হয়েছিল। অনেকের কাজ নেই, কেউ-কেউ করোনায় আক্রান্ত, মারা যাচ্ছে এমন। তবে এই সময়ের তুলনায় সেটি ছিল বেশি গুরুতর। কিন্তু সেসময়ও রেমিটেন্স কমেনি।”

“সেসময় দূতাবাসগুলোর উদ্যোগে যাদের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল, তাদের কিছু আর্থিক সহায়তা এবং কম টাকায় খাদ্যসহ নিত্যপণ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছিল।”

সেসময়ের মতো কিছু শর্ত নির্ধারণ করে বিভিন্ন দেশে সংকটে থাকা প্রবাসীদের সহায়তার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “যদিও লাখ লাখ মানুষের জন্য সেই ‘সাপোর্ট’ দেওয়াটা কঠিন—কিছু ‘ক্রাইটেরিয়া’ যদি ঠিক করা যায় যে, কারোর একেবারে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণের আয়ের নিচে যাদের আয়, অথবা আসলেই কাজ নাই, তারা যদি মিশনে আবেদন করেন, সেরকমভাবে তারা কোনো রকম ওই জীবন নির্বাহের ভাতার মতো সাময়িকভাবে পেতে পারে কিনা।

“একটা তহবিল যদি সরকার দিতে পারে, বিশেষ তহবিল, সেটা একটা উপায় হতে পারে।”

তিনি বলছিলেন, “এখন সংকট যে হবে, সেটা তো আমরা আগেই বুঝতে পারছিলাম। এমনকি যুদ্ধ যদি থেমেও যেত বা এখনো যদি যায়, এটার প্রভাব থাকবে। কারণ, তেলের দাম বেড়ে গেছে, তো দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাবে, এটা তো স্বাভাবিক। আমাদের দেশেও আমরা কিছুটা ‘ফিল’ করছি, ওখানে তো তারা আরও বেশি করবে।”

সরকার কী বলছে?

প্রবাসীকল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (কর্মসংস্থান অনুবিভাগ) মো. শহীদুল ইসলাম চৌধুরী  বলেন, “প্রবাসীরা যে সমস্যায় আছে, এটা তো সারা পৃথিবীতেই আছে। বাংলাদেশেও তো সমস্যা। এই যে তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আমরাও তো এক ঘণ্টা অফিস আওয়ার কমিয়ে দিছি। আমাদের সমস্যা হচ্ছে না?

“এটা স্বাভাবিক একটা বিষয় যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে যেহেতু বাংলাদেশের সবচেয়ে কর্মীরা বেশি থাকে, সেখানে কিছু কিছু সমস্যা হচ্ছে। আমরা আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে বহু ব্যবস্থা নিয়েছি।”

তিনি বলেন, “এখানে একটা হটলাইন চালু করা হয়েছে, ২৪ ঘণ্টা প্রবাসীদের অভিযোগগুলো নেওয়া হয়। তারা কী সমস্যায় আছে, তাদের জন্য কী সহযোগিতা প্রয়োজন—এগুলো কিন্তু এখান থেকে মনিটর করা হচ্ছে। এবং কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে, ২৪ ঘণ্টা তারা ডিউটি করে এখানে।”

সরকার প্রবাসীদের ব্যাপারে সর্বোচ্চ আন্তরিক মন্তব্য করে তিনি বলেন, “যে তথ্যগুলো আমরা পাই, সাথে সাথে আমাদের ওই দূতাবাসে জানানো হয় যে, তাদেরকে যেন ‘প্রপারলি’ সহযোগিতা করা হয়। এটুকু আমরা করছি।

“এবং কেউ মারা গেলে তাদেরকে আমরা যথারীতি সহায়তা দিচ্ছি। বিষয়টি সরকার সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। প্রধানমন্ত্রী, আমাদের মন্ত্রী সংসদে বলেছেন যে প্রবাসীদের পাশে আমরা সবসময় আছি। এবং যেকোনো সহযোগিতার জন্য আমরা প্রস্তুত। প্রস্তুত না শুধু, আমরা করছি। খুব বেশি প্রবলেম হলে সেক্ষেত্রে পরবর্তীতে সরকার তার সহযোগিতা আরও বাড়াবে।” সূত্র: বিডিনিউজ।

প্রবাস থেকে আরো পড়ুন