অর্থনীতিতে চাপের আশঙ্কা
প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ০২:০৯
বাংলাদেশ ব্যাংক
চলতি অর্থবছরে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ঋণ নিয়ে ফেলেছে সরকার, ফলে অর্থনীতিতে চাপ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে ব্যয় বাড়ানোর প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু মার্চ পর্যন্ত সময়ে সরকার ইতোমধ্যে ১ লাখ ১২ হাজার ৭১১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়েও বেশি ঋণ নেওয়া হয়ে গেছে।
গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ৫৩ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা। পরবর্তী তিন মাসেই প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা নতুন ঋণ নেওয়া হয়েছে, যা ঋণ বৃদ্ধির গতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এখন অর্থবছরের বাকি সময়ের ব্যয় মেটাতে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা স্বল্পমেয়াদি ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, আর আয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা ঋণের মাধ্যমে পূরণ করার পরিকল্পনা ছিল।
কিন্তু জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম আট মাসেই রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৭১ হাজার কোটি টাকার বেশি কম হয়েছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ঘাটতি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রাজস্ব ঘাটতি, ঋণের সুদ পরিশোধ এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সরকারের ব্যয় বাড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় চাপ আরও বেড়েছে।
বর্তমানে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকগুলো সরকারকে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক এক নিলামে সরকার যেখানে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা তুলতে চেয়েছিল, সেখানে ব্যাংকগুলো ১৬ হাজার ৭৭২ কোটি টাকার প্রস্তাব দেয়।
এতে বোঝা যাচ্ছে, ব্যাংক খাতে তারল্য থাকলেও তা উৎপাদন খাতে না গিয়ে সরকারের ঋণ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মাহমুদ ওসমান ইমাম বলেছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সরকারের সুদ ব্যয় বেড়ে যাবে এবং আর্থিক শৃঙ্খলা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন সতর্ক করে বলেন, “আয়ের পথ না বাড়িয়ে ব্যয় বাড়ালে দুর্দশা বাড়বে।” তার মতে, ঋণের মাধ্যমে ব্যয় চালানো হলেও ভবিষ্যতে সেই অর্থ থেকে আয় সৃষ্টি না হলে চাপ জনগণের ওপরই পড়বে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শুধু নতুন বিনিয়োগই নয়, বেসরকারি খাতের চলমান কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
অতিরিক্ত ঋণের ফলে সুদ ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহ বেড়ে গেলে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা থাকলে পণ্যমূল্য আরও বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখনই রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা না আনলে ভবিষ্যতে অর্থনীতি আরও চাপে পড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে— কীভাবে ঋণনির্ভরতা কমিয়ে টেকসই অর্থনৈতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা যায়।
অর্থনীতি থেকে আরো পড়ুন