প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬ ২৩:২১
দেশে আবারও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হামের সংক্রমণ। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কে সংক্রমণসহ জটিল রূপ নিচ্ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি, দ্বিতীয় ডোজ না নেওয়া, ক্যাচ-আপ কর্মসূচির ব্যর্থতা এবং শিশুদের পুষ্টিহীনতা মিলেই পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিনই বাড়ছে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। রাজধানীসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি। চিকিৎসকরা বলছেন, আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশই কম বয়সী এবং অনেকের শরীরে আগে থেকেই রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল।
মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই হামে আক্রান্ত হয়ে কয়েকশ শিশু ভর্তি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। পরীক্ষিত নমুনার বড় অংশেই এবার হাম শনাক্ত হচ্ছে, যা সংক্রমণের ব্যাপকতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত শিশু থেকে ১০ থেকে ১৫ জন, এমনকি তারও বেশি শিশু সংক্রমিত হতে পারে। হাঁচি-কাশি, কথা বলা কিংবা ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এই রোগ দ্রুত ছড়ায়। সাধারণত জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া, মুখের ভেতরে দাগ এবং পরে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে হামের আশঙ্কা থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম ঠেকাতে দুই ডোজ টিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ডোজ ৯ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাস বয়সে দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক শিশু প্রথম ডোজ নেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজ আর নেয় না। ফলে পূর্ণ সুরক্ষা তৈরি হয় না।
এ ছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর পর যে অতিরিক্ত ক্যাচ-আপ টিকাদান কর্মসূচি হওয়ার কথা, তাতেও বিঘ্ন ঘটেছে। করোনাকালে টিকাদান কর্মসূচি বড় ধরনের ধাক্কা খায়। পরে সেই ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ না হওয়ায় কয়েক বছরের একটি সুরক্ষা-ফাঁক তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু টিকার ঘাটতিই নয়, পুষ্টিহীনতাও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। ঢাকার বস্তি এলাকা এবং উত্তরাঞ্চলের দরিদ্র পরিবারগুলোর শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ও জটিলতা বেশি দেখা যাচ্ছে। অপুষ্ট শিশুদের ক্ষেত্রে হাম মারাত্মক আকার নিতে পারে।
হাম পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, সময়মতো টিকাদান জোরদার করা গেলে এত বড় বিস্তার ঠেকানো সম্ভব ছিল। তারা দ্রুত সারাদেশে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি, আক্রান্ত এলাকায় বাড়ি বাড়ি নজরদারি এবং শিশুদের পুষ্টি সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
সরকার জানিয়েছে, আক্রান্ত এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানো হচ্ছে। বড় হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং গুরুতর রোগীদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা সুবিধাও বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে বড় কর্মসূচির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে হাম আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে। তাই শুধু চিকিৎসা নয়, টিকাদান, সচেতনতা, পুষ্টি এবং পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করাই হবে এই সংক্রমণ ঠেকানোর প্রধান উপায়।
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন