বাংলাদেশ

১৮ মাসেও কথা রাখেনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার

কোটা নিয়োগের প্রকৃত হিসাব, উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণ এবং ভারতের সঙ্গে করা চুক্তিগুলোর স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেয়নি সরকার। একই সঙ্গে ৫ আগস্টের আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে।

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ০৪:২০

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ শেষে স্বাক্ষর করছেন ড. মুহাম্মদ ইউনুস। ছবি: সংগৃহীত

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে রাজনৈতিক–সামাজিক আলোচনায় প্রধান ইস্যুগুলো এখন অন্তর্বর্তী সরকারের দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতা, শিক্ষার্থীদের ও নাগরিকদের ভ্রান্ত প্রত্যাশা, এবং গত ৫ আগস্টের ঘটনা থেকে পরিবর্তিত বাস্তবতা।

বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সহিংসতায় মধ্যেই পতন হয়েছিল আগের সরকার। সেই সময়কার কোটা সংস্কার আন্দোলন, সরকারি চাকরিতে স্বচ্ছতা ও প্রতিশ্রুতির পুনরুদ্ধারের দাবি নিয়ে দেশজুড়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, যা পরে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের জন্ম দেয়। আন্দোলনের সময় জনগণের কাছে আশাব্যঞ্জক কথা ছিল—স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নৈতিক রাজনীতির নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও সেই কথাগুলোর বাস্তবায়ন অনুপস্থিত থাকায় এখন সমাজের বিভিন্ন স্তরে হতাশা ও সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ

কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়েই এই সরকার ক্ষমতায় আসে। আন্দোলনের সময় বারবার বলা হয়েছিল, সরকারি চাকরিতে বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় প্রকৃতপক্ষে কতজন নিয়োগ পেয়েছেন, তার একটি সুনির্দিষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ হিসাব জাতির সামনে তুলে ধরা হবে। তখন প্রচার করা হয়েছিল, মুক্তিযোদ্ধা কোটার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা পরিবার অস্বাভাবিকভাবে বেশি সুযোগ পাচ্ছে এবং সেটিই নাকি বৈষম্যের মূল কারণ।

কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলে এখন নানা মহলে আলোচনা হচ্ছে। দেড় বছর পার হলেও মুক্তিযোদ্ধা কোটায় মোট কতজন নিয়োগ পেয়েছেন, কোন কোন বছরে, কোন কোন মন্ত্রণালয় বা দপ্তরে সেই নিয়োগ হয়েছে তার কোনো সমন্বিত তালিকা সরকার প্রকাশ করেনি। শিক্ষার্থী সমাজ, মুক্তিযোদ্ধা পরিবার এবং বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের প্রশ্ন, যদি বাস্তবে নিয়োগের সংখ্যা সীমিত হয়ে থাকে, তাহলে সেই তথ্য প্রকাশে সরকারের অনীহা কেন।

বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, কোটা আন্দোলনের সময় মুক্তিযোদ্ধা কোটাকে ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করা হয়েছিল। একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জনমনে বিরূপ ধারণা তৈরি করা হয়েছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। এখন যদি প্রকৃত পরিসংখ্যান প্রকাশ পায়, তাহলে সেই অপপ্রচারের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। সে কারণেই সরকার বিষয়টি নিয়ে গড়িমসি করছে কি না, এমন প্রশ্ন উঠছে। তবে এসব অভিযোগের জবাবে সরকার এখন পর্যন্ত কোনো বিস্তারিত তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা দেয়নি।

উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নে সরকারের আরেকটি বড় প্রতিশ্রুতি ছিল উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে ড. মুহাম্মদ ইউনুস ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি এবং তার সরকারের উপদেষ্টারা নিজেদের সম্পদের পূর্ণ বিবরণ জনগণের সামনে তুলে ধরবেন। সে সময় অনেকেই এটিকে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হিসেবে দেখেছিলেন।

কিন্তু বাস্তবে দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও সেই সম্পদ বিবরণ প্রকাশ হয়নি। এই সময়ের মধ্যে কয়েকজন উপদেষ্টা দায়িত্ব ছেড়েছেন, নতুন উপদেষ্টা যুক্ত হয়েছেন। তবুও দায়িত্ব গ্রহণের আগে বা দায়িত্ব ছাড়ার সময় কার সম্পদ কত ছিল, সে বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি কতটা আন্তরিক ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে।

ভারত বিরোধিতা এবং চুক্তিনামা

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও সরকারের অবস্থান নিয়ে দ্বন্দ্বমূলক আলোচনা চলছে। সরকার ও উপদেষ্টারা একাধিকবার বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি করা হয়েছে। কিন্তু দেড় বছরেও সেই চুক্তিগুলোর কোনোটিই বাতিল করা হয়নি, এমনকি পূর্ণাঙ্গভাবে জনসমক্ষে প্রকাশও করা হয়নি। বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, ভারতবিরোধী বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয়তা পেলেও নীতিগত পর্যায়ে ভারতের প্রতি সরকারের আচরণ বেশ নমনীয়। এমনকি ভারত থেকে পণ্য আমদানি অব্যাহত আছে  আগের চেয়ে বেশি। সেইসাথে ভারত সরকারকে উপঢৌকন হিসেবে পাঠানো হচ্ছে ইলিশ, আম ইত্যাদি।

সমালোচকদের মতে, সরকার একদিকে ভারতের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করেছে, অন্যদিকে বাস্তবে আগের অবস্থান থেকেই সরে আসেনি। ফলে কথাবার্তা ও বাস্তব নীতির মধ্যে স্পষ্ট ফারাক তৈরি হয়েছে।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কথিত অভিযোগ

আরও অভিযোগ উঠেছে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হলেও সরকার এখন পর্যন্ত কোনো বড় দুর্নীতির সুস্পষ্ট প্রমাণ জাতির সামনে হাজির করতে পারেনি। উল্টো অভিযোগ রয়েছে, ড. ইউনুস নিজেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল অঙ্কের কর ছাড় বা কর মওকুফের সুবিধা নিয়েছেন, যা নৈতিকতার প্রশ্নে সরকারকে আরও বিব্রত করছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কোটা সংস্কার আন্দোলন ও সরকার পরিবর্তনের মূল শক্তি ছিল নৈতিকতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির দাবি। কিন্তু ক্ষমতায় এসে সেই দাবিগুলোর দৃশ্যমান বাস্তবায়ন না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে তরুণদের বড় একটি অংশের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। তাদের অনেকেই মনে করছেন, আন্দোলনের সময় যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তা এখন রাজনৈতিক বক্তৃতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

আগামী নির্বাচনের আগে এসব বিষয় সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কোটা নিয়োগের প্রকৃত হিসাব, উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণ এবং ভারতের সঙ্গে করা চুক্তিগুলোর স্বচ্ছ ব্যাখ্যা না এলে সরকারবিরোধী সমালোচনা আরও তীব্র হবে। একই সঙ্গে ৫ আগস্টের আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে।

এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো স্পষ্ট সময়সূচি বা আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা আসেনি। ফলে নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এই ইস্যুগুলোই দেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আরও জোরালোভাবে উঠে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেইসাথে জনগণের আশা এবং আকাঙ্খার প্রতিফলন না ঘটায় বর্তমান সরকার জনগণের কাছে একটি ব্যর্থ সরকার হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।

বায়ান্ননিউজ২৪/এডিটর ইন চীফ

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন