বাংলাদেশ

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন, রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়

প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ২২:৫০

তারেক রহমান

দীর্ঘ দেড় যুগ লন্ডনে রাজনৈতিক নির্বাসনে থাকার পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আগামীকাল বাংলাদেশে ফিরছেন। এই প্রত্যাবর্তন শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার দেশে ফেরা নয়, বরং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তারেক রহমানের দেশে ফেরা ঘিরে বিএনপির ভেতরে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটছে। একই সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও এটি নতুন বাস্তবতার সূচনা করছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

২০০৭ সালের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে গ্রেপ্তার, কারাবাস এবং নির্যাতনের অভিযোগের পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে চিকিৎসার জন্য দেশ ছাড়েন তারেক রহমান। পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন, যা কয়েক বছরের মধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়।

বিএনপির পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন দাবি করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার দেশে ফেরার পথ বন্ধ ছিল। যদিও সেই সরকারের পতনের প্রায় পনেরো মাস পরও তিনি দেশে ফেরার জন্য পরিস্থিতি তার অনুকূল নয় বলে জানিয়েছিলেন। 

তারেক রহমান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান। শৈশব থেকেই তিনি রাজনীতি ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর কাছাকাছি পরিবেশে বেড়ে ওঠেন।

আশির দশকের শেষ দিকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি মায়ের সঙ্গে রাজপথে সক্রিয় হন। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতিতে তার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। তবে দলের ভেতরে তার প্রকৃত উত্থান ঘটে ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময়।

২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর তারেক রহমান দ্রুত দলের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। এই সময় রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত হাওয়া ভবনকে ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সমালোচকদের মতে, এটি সরকারের একটি সমান্তরাল ক্ষমতাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। যদিও বিএনপি এসব অভিযোগ বরাবরই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সময় থেকেই তারেক রহমানের উত্থানের পাশাপাশি তাকে ঘিরে বিতর্ক, সমালোচনা ও বিরোধিতা তীব্র আকার ধারণ করে।

২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর তিনি গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকেন। এ সময় তার ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তোলে বিএনপি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার কিছু প্রতিবেদনে সে সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক বন্দিদের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল।

পরবর্তীতে মুক্তি পেয়ে দেশ ছাড়লেও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলাসহ একাধিক মামলায় সাজা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এসব মামলার বড় অংশ থেকে তিনি অব্যাহতি পান।

২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাবন্দি হলে তারেক রহমানকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে প্রায় এক দশক তিনি লন্ডন থেকেই দল পরিচালনা করে আসছেন, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল একটি ঘটনা।

ডিজিটাল মাধ্যমে বক্তব্য, ভার্চুয়াল সভা এবং সরাসরি সাংগঠনিক নির্দেশনার মাধ্যমে তিনি তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখেন। এক পর্যায়ে আদালতের নির্দেশে তার বক্তব্য প্রচার বন্ধ হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সক্রিয়তা দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তাকে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাসিত বিরোধী নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যমগুলো তার রাজনৈতিক আশ্রয়, আইনি অবস্থান এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে সরাসরি নেতৃত্ব নেওয়ার ঘটনা খুব বেশি দেখা যায় না। সে কারণেই তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণানুযায়ী আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বিএনপি ইতোমধ্যেই জানিয়েছে, এই নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দেবেন তারেক রহমান এবং তিনিই প্রথমবারের মতো সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, অতীতের বিতর্কের রাজনৈতিক ভার সামলানো এবং নিজেকে শুধু দলীয় নেতা নয়, বরং জাতীয় নেতৃত্বের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

অনেক বিশ্লেষক তার এই প্রত্যাবর্তনকে রাজনৈতিক ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সঙ্গে তুলনা করছেন। দীর্ঘ নির্বাসন, মামলা ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দলীয় নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সক্ষমতা তাকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যতিক্রমী চরিত্রে পরিণত করেছে।

তবে এই প্রত্যাবর্তন বিএনপিকে কতটা ক্ষমতার রাজনীতিতে এগিয়ে নিতে পারবে, নাকি নতুন রাজনৈতিক সংঘাতের সূচনা করবে, সেটিই এখন দেশের রাজনীতির বড় প্রশ্ন।

বায়ান্ননিউজ২৪/এডিটর ইন চীফ

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন