পিবিআই এখন পর্যন্ত যে মামলাগুলোর তদন্ত সম্পন্ন করেছে, তার মধ্যে প্রায় ৫৬ শতাংশ মামলায় অভিযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ ০১:৪৭
জুলাইয়ের ৫৬ শতাংশ মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত নয়
এডিটর ইন চীফ, বায়ান্ননিউজ২৪:
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে দায়ের করা মামলাগুলো নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর দীর্ঘ তদন্তে দেখা গেছে, এসব মামলার অধিকাংশই ভিত্তিহীন, মিথ্যা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দায়ের করা। বাদী-সাক্ষী থেকে শুরু করে আসামির তালিকা—সব ক্ষেত্রেই ব্যাপক অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।
পিবিআই এখন পর্যন্ত যে মামলাগুলোর তদন্ত সম্পন্ন করেছে, তার মধ্যে প্রায় ৫৬ শতাংশ মামলায় অভিযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অনেক মামলা আদালতে ফাইনাল রিপোর্ট হিসেবে জমা পড়েছে—যেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, বাদী, সাক্ষী কিংবা অভিযোগ—কোনোটিরই বাস্তব অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
তদন্তে দেখা গেছে:
বহু মামলার বাদীর জাতীয় পরিচয়পত্র জাল।
যেসব মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে মামলা করা হয়েছে, সেগুলোর কোনোটি আসামির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়।
অধিকাংশ সাক্ষীর দেওয়া নাম-ঠিকানা তদন্তে মিলেনি।
বাদীদের অনেকে মামলার পর আর খুঁজেই পাওয়া যায়নি।
পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজি মোস্তফা কামাল জানান, অনেক মামলায় এমন ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে, যারা কখনো ঢাকায়ই যাননি। চট্টগ্রাম, বরিশাল, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার নিরীহ মানুষ এসব মামলায় আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন।
তিনি বলেন, “শত শত মানুষের নাম একসাথে আসামি করা হয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে ঘটনার সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততার প্রমাণ নেই। নিরীহ মানুষকে হয়রানি না করার জন্য আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে তদন্ত করেছি।”
বহু আইনজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় আন্দোলন-পরবর্তী পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিতভাবে বিরোধী মতাবলম্বী, আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রণয়ন করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও এসব মামলায় আসামি হয়েছেন।
রাজনৈতিক মহলে দাবি উঠেছে—এসব মামলা সমাজে বিভাজন ও ভয় সৃষ্টির উদ্দেশ্যে, এবং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বৃত্তকে দুর্বল করার লক্ষ্যেই দায়ের করা হয়েছিল।
মিরপুর ইসিবি চত্বরে হামলায় আহত হওয়ার দাবি করে “মো. আব্দুল আজিজ” নামের এক ব্যক্তি একটি হত্যা-চেষ্টা মামলা করেন। ২২ জনের নাম-সহ অজ্ঞাত ২০০-২৫০ জনকে আসামি দেখানো হয়।
কিন্তু পিবিআই-এর তদন্তে:
বাদীর ঠিকানা ভুয়া,
জাতীয় পরিচয়পত্র জাল,
মামলায় দেওয়া ফোন নম্বর অন্য একজন নারীর,
কোনো সাক্ষীর অস্তিত্ব নেই।
ফলে মামলা ফাইনাল রিপোর্ট হয়ে খারিজ হয়।
সিরাজগঞ্জের কৃষকের নাম ঢুকেছে দুই মামলায়এক মামলায় ১১ নম্বর আসামি আব্দুল লতিফ নামে একজন কৃষক জানান, তিনি গত ১০ বছরে ঢাকায় যাননি। স্থানীয় প্রভাবশালী এক ব্যক্তি শত্রুতা করে তাঁর নাম ঢুকিয়েছে।
বনানীতে গুলিবিদ্ধ দাবি করা বাদীর অস্তিত্ব নেইরাজিন ওরফে রাজন নামে এক ব্যক্তি বনানীতে গুলিবিদ্ধ হওয়ার অভিযোগে একটি মামলা করেন। তদন্তে:
বাদী নিজেই ভুয়া,
মোবাইল নম্বর অন্যের নামে,
সাক্ষীরাও কাল্পনিক।
কিছু মামলায় ২০০ থেকে ৯০০ জন পর্যন্ত আসামি করা হয়েছে। তেজগাঁওয়ের এক হত্যা মামলায় ৯০০-এর বেশি অজ্ঞাত আসামি ছিল। তদন্ত কর্মকর্তা জানান, বাদীই ছিল “উৎসুক জনতা”, যার পরিচয়ই নিশ্চিত করা যায়নি।
আইন বিশ্লেষকদের মতে:
মামলাগুলোর মধ্যে ৬০–৭০ শতাংশই প্রমাণিত হবে না,
অনেকগুলো মামলা চাঁদাবাজি বা ব্যক্তিগত প্রভাব খাটানোর জন্য করা হয়েছে,
রাষ্ট্রীয় বল প্রয়োগ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
সিনিয়র আইনজীবীরা মনে করেন, মিথ্যা মামলা দায়েরকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
বিতর্ক বৃদ্ধি পাওয়ায়:
জুলাই আন্দোলন সংক্রান্ত মামলায় কাউকে গ্রেফতারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে,
ভুয়া আসামিদের নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে:
জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ১,৭৮৫টি মামলা হয়েছে,
চার্জশিট দেওয়া হয়েছে মাত্র ১০৬টিতে,
প্রায় আড়াই হাজার মানুষকে ইতোমধ্যে অব্যাহতি দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো—কিছু মামলায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত আসামির নামই মিথ্যা বা ভিত্তিহীন।
যেমন:
গুলশান সিআর মামলা—৭৭ শতাংশ ভুয়া,
তুরাগ মামলা—৯০ শতাংশ ভুয়া,
বাড্ডা মামলা—৫৫ শতাংশ ভুয়া,
যাত্রাবাড়ীর কয়েকটি মামলায় ৪৮–৮৫ শতাংশ আসামি ভুয়া।
একটি মামলায় ২৫৩ জন আসামির মধ্যে মাত্র ২০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়, বাকি ২৩৩ জনের নাম বাদ দিতে হয়।
জুলাই আন্দোলনের সময় দায়ের হওয়া ভুয়া ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাগুলো দেশের প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন তুলেছে। নিরীহ মানুষকে হয়রানি, প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করা, অথবা চাঁদাবাজির মতো উদ্দেশ্যে এসব মামলা ব্যবহারের অভিযোগ এখন আরও জোরালো। পিবিআই-এর তদন্তে যে ব্যাপক অনিয়ম উন্মোচিত হয়েছে, তা দেশের বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা পুনঃস্থাপন করতে আরও স্বচ্ছতা ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
বায়ান্ননিউজ২৪/এডিটরইনচীফ
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন