অভিমত

একাত্তরের যুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ, তার প্রমাণ আমাদের মুক্তিবাহিনী

প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৩ ০১:৩৬

 বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে এখনও ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আমাদেরকে সজ্ঞানে, উচ্চস্বরে এগুলোর প্রতিবাদ করতে হবে। তাছাড়া 'বীর মুক্তিযোদ্ধা' কথাটা নিজে ব্যাবহার না করলেও আমি মনে করি এখন সময় এসেছে আমাদেরকে যথাযথ সম্মান দেয়ার। সময় এসেছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ঘটনা লিপিবদ্ধ করার।

কথা গুলো বলেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. নুরুন নবী। ১৬ মার্চ বৃহস্পতিবার প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার জনপ্রিয় সম্প্রচার টক অব দ্যা উইক অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন তিনি। স্বাধীনতার মাস এই মার্চে মহান স্বাধীনতা আর জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ড. নুরুন নবী নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে দর্শকদের সম্মুখে বহু মুল্যবান তথ্য প্রকাশ করেন। এই বীর মুক্তিযোদ্ধার মুখে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের অগ্নিঝরা ভাষণের তাৎপর্য, গণহত্যা ও স্বাধীনতা ঘোষণার কথা অনুষ্ঠানকে এক ভিন্ন পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছিল।  

ড. নুরুন নবী, ভাষা ও সাহিত্যের জন্য একুশে পদক পেয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি তাঁকে সম্মানসূচক ফেলোশিপ প্রদান করেছে। নিউজার্সির প্লেন্সবরো টাউনশিপ কাউন্সিলে বার বার নির্বাচিত হয়ে আসছে বিজ্ঞানী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. নুরুন নবী।

সেদিনের সেই ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে নুরুন নবী সশরীরে রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত ছিলেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের তাৎপর্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে নুরুন নবী বলেন, “বাঙালি জাতির জন্যে ১৯৭১ সালের মার্চ মাস ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ একটি মাস। তৎকালীন সময় বঙ্গবন্ধু ছিলেন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠের নেতা, তাঁর জন্যেও একাত্তরের মার্চ মাস ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুর জন্মমাসও ছিলো মার্চ। রেসকোর্সের ময়দানে দেয়া ভাষণের কথাগুলো ছিল অলিখিত। আমাদের অনেকের কাছে সেই ভাষণই স্বাধীনতার ঘোষণা বলে বদ্ধমূল ধারণা হয়েছিল। …এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম… তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে…তাৎপর্যপূর্ণ কথাগুলো বঙ্গবন্ধুর মন ও মস্তিস্ক থেকে নিঃসৃত হয়েছিল।“

ড. নুরুন নবী অন্দোলনের কারণ সম্পর্কে বলেন, “বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালের পর তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বাঙালির স্বাধিকার আদায় হবে না। প্রতিবাদ ও আন্দোলনের মাধ্যমেই ন্যায্য দাবিগুলো প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেই লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় ছাত্রলীগ নামক সংগঠন। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখলেন, বিরোধী দল হিসাবে  আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করলেন। এভাবেই তিনি হয়ে উঠলেন পূর্ব বাংলার বাঙালিদের একজন উদীয়মান তরুণ নেতা। ছয় দফা সমর্থনে জনগণের মনোভাব জানার জন্যে বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালে ময়মনসিংহে এসেছিলেন। আমি তখন আনন্দ মোহন কলেজের ছাত্র, সেইদিনই তাঁকে প্রথম দেখি। একজন সুপুরুষকে সেদিন দেখেছিলাম, লম্বা, কালো চশমা চোখে, ব্যাক ব্রাশ করা চুল, সাদা পাঞ্জাবি পরেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠের ভাষণ শুনে আমি তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম, আমার নেতা হিসাবে মনোনীত করেছিলাম। তারপরের সময়ে মুক্তির সংগ্রামের অসহযোগ আন্দোলনের সাথে কর্মী হিসাবে আমি যুক্ত হতে পেরেছিলাম। “

এভাবেই ডা. নুরুন নবী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। বঙ্গবন্ধুর মুক্তি, ছয় দফা বাস্তবায়ন, পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পদত্যাগ দাবি, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়ে তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তখন আন্দোলনে যোগদান করেছিলেন। গণ-অভ্যুত্থানের পরেই শেখ মুজিবুর রহমানকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভুষিত করা হয়। ছয় দফার ভিত্তিতে তিনি নির্বাচন করে জয়লাভ করেন। কিন্তু পাকিস্তান সকার কোনভাবেই বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে শাসন করতে দিতে ইচ্ছুক হয়নি। বাঙালির বিরুদ্ধে সেই ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে কিভাবে ড. নুরুন নবী জড়িয়ে পড়েছিলেন তা সম্পর্কে তিনি বলেন,“সেইসময় আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগের ছাত্র ছিলাম। অনার্স পরীক্ষা শেষের দিনে কার্জন হলে লাঠি মিছিল ও স্লোগান শুরু হয়। আমরা পল্টন ময়দানে যেয়ে মিছিলে যোগদান করি।“

সেই ভয়াল কালরাত্রির অভিজ্ঞতা জানিয়ে ড. নুরুন নবী বলেন, “৩ মার্চ পল্টনে মিটিঙের সময় ছাত্ররা বঙ্গবন্ধুর গাড়িতে পতাকা লাগিয়ে দেয়, তখন কলাভবনে ছাত্র জমায়েতের সময়েও এই পতাকা উত্তোলিত হতো। সেটি ছিল লাল-সবুজের পতাকা, লাল বৃত্তের ভিতরে বাংলাদেশের মানচিত্র। পতাকার নকশা নিয়েও আছে মতবিরোধ, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পতাকা বানাত, এটা বাইরে কিনতে পাওয়া যেত না। ইকবাল হলে পতাকা ডিজাইন করতো দর্জিরা। ২৩ মার্চ ছিল পাকিস্তান দিবস, সেদিন সারা বাংলাদেশে পাকিস্তানি পতাকার বদলে বাংলাদেশের পতাকা উড়েছিল। এই ব্যাপারটাও একটা ঐতিহাসিক ব্যাপার ছিল সেদিন। ২৭ শে মার্চ কারফিউ তোলা হলো, আমি তখন বাসা থেকে বের হয়ে নিউমার্কেট পার হবার সময় দেখি মার্কেটের পাশে কাঁচা বাজারে রিকশা-ঠ্যালাগাড়ির ওপর সারি সারি মৃতদেহ পড়ে আছে। জীবনের এই প্রথম এত মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখে আমি ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। ইকবাল হলের পাশের বস্তি পুড়ে ছাই হয়েছে, বাগানের চত্বরে কিছু লাশ পড়ে ছিল, কামান দিয়ে শহীদ মিনার গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। সেদিন ঢাকা শহরে দশ হাজার ছাত্র-জনতা-নেতাকর্মীকে মেরে ফেলা হয়েছিল। এই গণহত্যার খবর ঢাকায় আমেরিকান দূতাবাস থেকে হোয়াইট হাউজে জানানো হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় মার্কিন প্রশাসন এই ব্যাপারে কর্ণপাত করে নাই।“

ড. নুরুন নবী আশাবাদী হয়ে আরও বলেন, “স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব নেন, তখন দেশে ও বিদেশে থাকা মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বিজয়কে ছিনিয়ে নেয়া, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাগুলো নিভিয়ে দেয়া। এই কারণে স্বাভাবিকভাবেই মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস রচনা করা, শহীদদের তালিকা গঠন, যুদ্ধপরাধীর বিচার করা ব্যাহত হয়েছিল। ত্রিশ লক্ষ শহীদকে চিহ্নিত করে সত্যিকারের সম্মান প্রদর্শন করা হয়নি। তবে বর্তমানে এই কাজগুলো এগিয়ে যাচ্ছে, সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে যথাযথভাবে।“

এভাবেই স্মৃতিবিজড়িত আলাপ আলোচনার মাধ্যমে আগুনঝরা মার্চের টক অব দ্যা উইক  অনুষ্ঠানটি শেষ হয়। অনুষ্ঠানে সঞ্চালনায় ছিলেন ফরিদা ইয়াসমিন এবং কারিগরি সহায়তায় ছিলেন এইচ বি রিতা। প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার এই জনপ্রিয় অনুষ্ঠান প্রতি বৃহস্পতিবার রাত নয়টায় প্রচারিত হয়ে থাকে।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন