ঐতিহাসিক ধানমণ্ডি ৩২
হঠাৎ করে গতকাল সন্ধ্যায় বাড়িওয়ালা বললো, বাসাটা ছেড়ে দিতে হবে আমাকে।২০২৪ সালের ৫ ই আগষ্ট বেলা এগারোটায় এইভাবেই শেখ হাসিনাকে উৎখাতের নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন ওয়াকার।আইপিআর থেকে বিটিভির মহাপরিচালককে জানানো হলো , সেনাপ্রধান বেলা দুইটায় জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিবেন। শেখ হাসিনাকে গণভবন থেকে বের করে দেওয়ার প্রক্রিয়া সেই সময় চূড়ান্ত।সময় দেয়া হলো মাত্র ৪৫ মিনিট!
১৫ ই আগষ্ট শেখ মুজিবের পুরো পরিবারকে হত্যার পর পৌনে ছয়টার দিকে বেতার ভবনের শিপট ইনচার্জ প্রণব বাবুর মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে মেজর ডালিম বলেছিলো,
"???????????????????????? ???????????????????? ???????????? ???????????? ???????????? ???????????????? ???????????? ???????????????? ???????????????????????? ???????????? ???????????????? ???????????? ???????????????????? ????????????????????." বেতারের ঘোষণা লিখতে লিখতেই ট্রান্সমিটার চালু করার সময় মেজর ডালিম বলে,
" এখন একটি ঘোষণা দেওয়া হবে, যদি তা শোনা না যায় তাহলে সবাইকে শেষ করে ফেলবো।'' মেজর ডালিমের ভাষায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চীফ প্রসিকিউটর শিবিরের তাজুল যখন আদালতে শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার মুহুর্তের কথা বলছিলো, তখন সে ফোর গ্যাং স্টার ও শেখ হাসিনার একটি বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে আনতেই আমি যেন মেজর ডালিমের পদধ্বনি শুনতে পেলাম।১৫ ই আগষ্ট ভোর পাঁচটায় শেখ মুজিবুর রহমানের বত্রিশ নাম্বারের বাড়িতে ঢুকে এক এক করে শেখ মুজিবের পরিবারের সকল সদস্যদের হত্যা করা হয়।দশ বছরের শিশু রাসেল ও শেখ ফজলুল হক মণির স্ত্রী আরজু মনির গর্ভের সন্তান সহ পরিবারের নিরীহ নারী সদস্যদের পর্যন্ত হত্যা করে বন্দুক উঁচিয়ে বেতার ভবনের সামনে মেজর ডালিম বলছিলেন, ???????????????????????? ???????????????????? ???????????? ???????????? ???????????????? ???????????? ???????????????? ????????????????????????! সেদিন সকাল থেকে বেলা বারোটা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে লুটপাট চালানোর পর সেনাবাহিনীর আরেকদল কর্মকর্তা এলে সেনা অফিসার বলেন, ???????????? ???????????? ????????????????????????????????! একটা পরিবারের ছোট ছোট শিশুদের পর্যন্ত হত্যা করে একমাত্র পশুদের পক্ষেই এমন করে বলা সম্ভব।
গ্যাং শব্দের অর্থ হচ্ছে অপরাধীদের দল।দশ বছরের শিশু রাসেল ও আরজু মনির গর্ভের সন্তানও অপরাধী? শেখ কামালের বউ জাতীয় স্বর্ণপদক জয়ী অ্যাথলেট সুলতানা কামালও অপরাধী? পৃথিবীর ইতিহাসে এমন নৃশংস হত্যাকান্ডের ইতিহাস আপনি আর একটিও খুঁজে পাবেন না।সেই মেজর ডালিম ও খুনী জিয়ার উত্তরসুরীরা ২০২৪ সালের ৫ ই আগষ্ট প্রায় ৫০ বছর পর সেই বত্রিশে আবার হামলা চালায়।দশ হাজার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ধ্বংস করে।এমনকি সিঁড়িতে লেগে থাকা বঙ্গবন্ধুর রক্ত মুছেও খুনীর দল ক্ষ্যান্ত হয় না, পুরো বাড়ি আগুন লাগিয়ে দেয়।পশুত্বের এমন নগ্ন উল্লাস এই পৃথিবীর সৃষ্টি ইতিহাসে আর কেউ কোনকালে, কখনো দেখেছি কি? এতেও ক্ষান্ত হয়নি পশুর দল। মেজর ডালিমের গান বাজিয়ে সেই বাড়ির সামনে নৃত্য করে।এর কিছুদিন পর আবার বুলডোজার দিয়ে সেই বাড়ি ভাঙে। মহাবিশ্বের ১৩.৮ বিলিয়ন বছরের সৃষ্টির ইতিহাসে , পৃথিবীর ৪.৫ বিলিয়ন বছর সৃষ্টির ইতিহাসে , ৫১ কোটি দশ লক্ষ বর্গকিলোমিটারের আয়তনের পৃথিবীতে এমন নৃশংস ও বর্বর ঘটনার সাক্ষী আর কখনোই হয়নি পুরো পৃথিবীর মানুষ।
লুসিড ড্রিমকে এই বাসাটা আজ নয়তো কাল ছাড়তেই হতো । তবুও এই বাড়িতে লুসিড ড্রিমের চোখের জল, একাকীত্ব, গান, কবিতা আরো কত স্মৃতি মিশে আছে।এই বাড়িতেই লুসিড একা একা গান করতে করতে রান্না করতো।রাত জেগে ইভ্যুলুশন, অরিজিন অফ স্পিসিস, রিচার্ড ডকিন্সের ( দ্য সেলফিশ জিন), স্টিফেন হকিংয়ের ( থিওরি অফ এভরিথিং ও আ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম সহ বঙ্গবন্ধুর ( আমার দেখা নয়া চীন, কারাগারের রোজনামচা, অসমাপ্ত আত্মজীবনী) পড়তো। খুব মন খারাপ হলে লুসিড জানালা খুলে আকাশ দেখতো।সেই বাড়ি থেকেই বের করে দেয়া হচ্ছে লুসিডকে।এই সামান্য কষ্ট লুসিড সহ্য করতে পারছে না।অথচ ৫ ই আগষ্ট শেখ হাসিনাকে বন্দুক ঠেকিয়ে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে গণভবন ছাড়া করা হয়েছে। শেখ হাসিনা কীভাবে এত কষ্ট সহ্য করেছেন, এসব ভাবলেই লুসিড ড্রিম শিউরে উঠে।
ছোট্ট নাতনির জন্মদিনে গণভবনেই রান্না করেছেন শেখ হাসিনা। গণভবনের সবুজ মাঠে ছোট ছোট নাতনীদের সাথে শেখ হাসিনার হাস্যোজ্জ্বল ব্যান্ডমিন্টন খেলার সেই দৃশ্য এখনও আমার চোখে ভাসছে। পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী রান্না করছেন, এমন দৃশ্য দেখেও অবাক হয়েছি। শেখ হাসিনার ভ্যানে চড়ার সেইসব দৃশ্য এখনও আমাদের চোখে ভাসে।শেখ রেহানার ছেলে ববির সন্তান লীলা ও কাইয়ুসের সাথে গণভবনের সবুজ মাঠে ছোট্ট শিশুর মত দৌড়ে বেড়িয়েছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সজীব ওয়াজেদের মেয়ে সোফিয়া ওয়াজেদের সাথে এই গণভবনে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়েছেন শেখ হাসিনা।
শেখ হাসিনা শুধু একজন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন লেখক ও কৃষক। গণভবনের বারান্দায় বসে শেখ হাসিনা বই লিখতেন।২০০৯ সালে সমগ্র বাংলাদেশে " একটি বাড়ি একটি খামার ' প্রকল্প তিনিই চালু করেছিলেন। কৃষি ও কৃষক ছিল শেখ হাসিনার অস্তিত্ব জুড়ে। গণভবনকে শেখ হাসিনা কৃষি খামার বানিয়েছিলেন। গরীব দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে খাদ্য ঘাটতি পূরণে বাঙালির কৃষকের রাজকন্যা শেখ হাসিনাই ডাক দিয়েছিলেন কৃষি সবুজ বিপ্লবের। গণভবনের মাটিকে শেখ হাসিনা বানিয়েছিলেন " কৃষি স্বর্গ "। এই সম্পর্কে বলতে গিয়ে শেখ হাসিনা চ্যানেল আইয়ের শাইখ সিরাজকে বলেছিলেন, " শখ করে করলাম সবাইকে দিয়েথুয়ে খাওয়া যাবে।"
দিল্লীর সুলতান নাসিরউদ্দিন নিজে টুপি সেলাই করতেন । বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী হয়েও নিজে সেলাই করতেন। নিজের গৃহস্থালির কাজ নিজে করতেন। পৃথিবীর আন্তর্জাতিক ৫৬ টি পুরস্কারের মালিক ও ২১ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার জীবন ছিল বাংলার আর দশজন নারীর মতোই সাধারণ। অথচ ইচ্ছে করলেই শেখ হাসিনা বিলাসিতায় জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন।একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও শেখ হাসিনা নিজের খাবার উৎপাদন নিজেই করেছেন। একজন ব্যস্ত প্রধানমন্ত্রী হয়েও শেখ হাসিনা গণভবনে হাঁস- মুরগী ও মাছের খামার করেছেন।নিজে বড়শি দিয়ে মাছ ধরেছেন।নিজ হাতে হাঁস -মুরগী , হরিণ ও খরগোশদের খাবার দিয়েছেন। গণভবনের কবুতরগুলোও বড় বেশি ভালোবাসতো শেখ হাসিনাকে।৫ই আগষ্ট সেই শেখ হাসিনার গণভবন লুট হলো।লাইভ টেলিকাস্ট হলো। হাজার হাজার কোটি টাকা না বের হয়ে এক এক করে চোরের দল হাঁস , মুরগী , গরু , ছাগল , খরগোশ, হরিণ আর মিডল ক্লাস ফার্নিচার নিয়ে জাতির সামনে দিয়ে পালালো। অথচ গণভবন , ধানমন্ডি বত্রিশ ও সুধাসদন থেকে টন টন সোনা ও হীরা মেলার কথা ছিলো। ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচারের মিথ্যা গল্প সেইদিনই মিথ্যা হয়ে গেছিল। তবুও শেখ হাসিনা চুপচাপ নিরব চোখের জলে সেদিন বিদায় নিয়েছিলেন। একজন প্রধানমন্ত্রীর এমন ধৈর্য আমি এর আগে আর কোনদিন দেখিনি।
ভোরের আলো ফুটে উঠেছে।একটু পরেই হয়তো সূর্যটা উঁকি দিবে।জানালা দিয়ে আকাশ দেখছি আর ভাবছি , দুইদিন পর এই ঘরটি আমাকেও ছেড়ে দিতে হবে।১৯৮১ সালের ১৭ ই মে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের রাস্তায় এইভাবেই চিৎকার করে কেঁদেছেন।তার দশ বছরের ছোট ভাই শেখ রাসেল ধানমন্ডি বত্রিশের রাস্তায় এইভাবেই ক্রিং ক্রিং শব্দে সাইকেল চালাতো। দোতলায় দাঁড়িয়ে থাকতো শেখ রাসেলের হাসু আপা।
গণভবন লুট , ধানমন্ডি ৩২ লুট এমনকি শেখ হাসিনার স্বামীর বাড়ি সুধাসদনেও আগুন দেয়া হয়েছে।এটি কোন হলিউড মুভির দৃশ্য নয়।এটি একটি স্বাধীন দেশের ৫৪ বছরের রক্তমাখা ইতিহাসের চিত্র।
গরীব দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথা ভাবতে ভাবতে আমার আর সারারাত ঘুম হয়নি। শেখ হাসিনার মতো আমার ঘরও লুট হয়েছে, আগুন দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের হাজার হাজার মানুষকে গৃহহীন ও লক্ষ লক্ষ মানুষকে দেশছাড়া করা হয়েছে।নিজ নিজ বাড়ি ও পরিবারের কথা ভেবে সবাই হয়তো লুসিড ড্রিমদের মতো এক ফোঁটা চোখের জল ফেলছেন। কিন্তু আমিও শেখ হাসিনার মতো কাঁদতে ভুলে গেছি। আমার এখন আর সহজে চোখের জল আসে না। পরিবারের সবাইকে হারানো শেখ হাসিনার মতো আমিও স্থির হয়ে বসে থাকি। হৃদয়ে বাজে দেশ রক্ষার সংগ্রাম। স্টিফেন হকিংয়ের " দ্য গ্রান্ড ডিজাইন" এর মতো আমি শেখ হাসিনার চোখ দিয়ে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ দেখি। এই দেশটাকে বাঁচানোর স্বপ্নে আমি ঘুমাতে পারি না।রাত শেষে ভোর হয় কিন্তু লাল সবুজের সূর্য দেখা হয় না। তখনি যেন শেখ হাসিনা আমার মাথায় হাত রেখে বলে ,
" লুসিড ড্রিম, তোমার কষ্ট কি শেখ হাসিনার চাইতেও বেশী?"
আমার গায়ের লোম কাটা দিয়ে উঠে।আমি বাচ্চা শিশুর মতো কাঁদতে থাকি। আমি লুসিড ড্রিম হয়েও শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে পারলাম না ???? এই কষ্ট আমার মৃত্যুর শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত যাবে না। চোখের জল মুছে আমি মাথা উঁচু করে দাঁড়াই। বঙ্গবন্ধু ও লাখো শহীদের অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ আমরাই শেষ করবো। স্বাধীন বাংলার মাটিতে বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা ও ত্রিশ লক্ষ শহীদের সম্মান আমরাই ফিরিয়ে আনবো। দেশের প্রতিটি মায়ের কাছে এটা তার সন্তানদের ওয়াদা।
হুমায়ূন আহমেদের লেখা গানটি গাইতে গাইতে " দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন" এর পরিকল্পনা আঁকছি -
" এই দিন দিন নয় , আরো দিন আছে।
এই দিনেরে নিবে তোমরা সেই দিনেরও কাছে।"
সত্য সবসময় সুন্দর
লেখা : লুসিড ড্রিম, অনলাইন একটিভিস্ট ।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন