সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ ১৪:০৬
সার সংকটে দিশেহারা কৃষক
চলতি আমন মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সারের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। কোথাও পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আবার কোথাও দেখা দিয়েছে টিএসপি সারের তীব্র সংকট। এতে বাড়তি দামে সার কিনতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় আমন চাষে লাভ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন তারা।
জয়পুরহাটে সরবরাহ থাকলেও দাম বেশি
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জয়পুরহাটে ৭০ হাজার ৯৫ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ৯৭ শতাংশ জমিতে রোপণ শেষ হয়েছে। এখন ধানক্ষেতের পরিচর্যার সময় সারের বাড়তি দাম নিয়ে কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়ার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা হলেও খুচরা পর্যায়ে তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ থেকে ১ হাজার ৯৫০ টাকা পর্যন্ত।
একইভাবে ১ হাজার ৩৫০ টাকা দামের টিএসপি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার টাকা, ১ হাজার ৫০ টাকা দামের ডিএপি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং ১ হাজার ৫০ টাকা দামের এমওপি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকায়।
কালাই পৌর এলাকার কৃষক আমিনুর রহমান বলেন, দোকানে সরকারি মূল্যতালিকা টাঙানো থাকলেও বাস্তবে সেই দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। রসিদ চাইলে অনেক সময় সার দিতে অনীহা দেখানো হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ক্ষেতলালের কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, সারসহ কৃষিকাজের প্রায় সব ধরনের খরচ বেড়েছে। কিন্তু ধানের দাম সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে কৃষকদের জন্য চাষাবাদ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
স্থানীয় সার ব্যবসায়ীরাও কৃষকদের অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেছেন। তবে জেলা সার ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, চাহিদার তুলনায় সারের প্রাপ্যতা কিছুটা কম থাকলেও বিসিআইসির ডিলাররা বেশি দামে সার বিক্রি করছেন না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক একেএম সাদিকুল ইসলাম বলেন, সারের দাম বেশি নেওয়ার প্রমাণসহ অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মেহেরপুরে টিএসপির তীব্র সংকট
মেহেরপুরে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। চলতি আমন মৌসুমে জেলায় ২৬ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সার বরাদ্দ কম থাকায় সংকট তৈরি হয়েছে।
কৃষকদের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে ফেলেছে টিএসপি সার। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি ডিলারদের কাছে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক কৃষক প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার পাচ্ছেন না। কোথাও একটি আইডির বিপরীতে ৫ থেকে ১০ কেজির বেশি টিএসপি দেওয়া হচ্ছে না।
সদর উপজেলার উজুলপুর গ্রামের কৃষক কামরুল ইসলাম বলেন, ১ হাজার ৩৫০ টাকা দামের এক বস্তা সার বাজারে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। বাকিতে নিলে দাম আরও বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ তার।
আট বিঘা কলার জমির জন্য টিএসপি প্রয়োজন হওয়া এক কৃষক জানান, ডিলারের কাছে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তিনি প্রয়োজনীয় সার পাননি। শেষ পর্যন্ত একটি আইডির বিপরীতে মাত্র ১০ কেজি টিএসপি পেয়েছেন।
মেহেরপুরে সার সংকটের কারণ হিসেবে বরাদ্দের ঘাটতির কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীদের সংগঠনের নেতারাও। তাদের দাবি, বর্তমানে টিএসপি সার নিয়েই সবচেয়ে বেশি সংকট চলছে।
তবে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, মেহেরপুরে একই জমিতে বছরে তিন থেকে চারবার ফসল উৎপাদন হওয়ায় অন্যান্য এলাকার তুলনায় সারের চাহিদা বেশি। ফলে বরাদ্দ ও চাহিদার মধ্যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ
মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায় জানিয়েছেন, সার সংকট নিরসনে কৃষি বিভাগকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এর মধ্যে গাংনীর ধানখোলা ইউনিয়নের যুগিন্দা বাজারে ২০ বস্তা সারসহ একটি অটোভ্যান আটক করেন স্থানীয়রা। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে চালক শাহাবুল ইসলামকে ১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জব্দ করা সার সরকারি মূল্যে কৃষকদের মধ্যে বিক্রি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা কৃষি বিভাগ।
কৃষকদের দাবি, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা যাতে সরকার নির্ধারিত মূল্যের বাইরে সার বিক্রি করতে না পারেন, সে জন্য নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের আশঙ্কা, বাড়তি দামে সার কিনে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে শেষ পর্যন্ত তার চাপ পড়বে কৃষকের আয় ও বাজারদরের ওপর।
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন