যুক্তরাজ্যের ডানপন্থি রাজনৈতিক দল রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতারণার মামলায় দণ্ডিত তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী জর্জ কটরেলের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ফারাজের বিরুদ্ধে। তবে রিফর্ম ইউকে দাবি করেছে, কোনো সংসদীয় নিয়ম ভঙ্গ হয়নি।
রোববার (৫ জুলাই) প্রকাশিত সানডে টাইমস–এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার আগের এক বছরে জর্জ কটরেল ফারাজকে নিরাপত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনার জন্য কর্মী এবং অন্যান্য সহায়তা দিয়েছেন। এছাড়া লন্ডনের বাকিংহাম প্যালেসের কাছে কটরেলের ভাড়া নেওয়া একটি বাড়িও ফারাজ ব্যবহার করেছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
তবে রিফর্ম ইউকের ট্রেজারি মুখপাত্র রবার্ট জেনরিক এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ফারাজ তখন সংসদ সদস্য ছিলেন না এবং কটরেলের সহায়তা ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের ভিত্তিতে।
জেনরিক বলেন, "কোনো নিয়ম ভাঙা হয়নি। একজন রাজনীতিকেরও ব্যক্তিগত বন্ধু থাকতে পারে। বন্ধুর বাড়িতে থাকা বা বন্ধুর কাছ থেকে ব্যক্তিগত সহায়তা নেওয়া অপরাধ নয়।"
তিনি আরও জানান, সংসদ সদস্য হওয়ার আগে নিরাপত্তা ও কিছু কর্মী নিয়োগে কটরেল সহায়তা করেছিলেন। কিন্তু এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে সেই সহায়তা আর নেওয়া হয়নি।
তদন্তের দাবি লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের
বিষয়টি নিয়ে নতুন করে তদন্তের দাবি তুলেছে বিরোধী দল লিবারেল ডেমোক্র্যাটস। দলটির এমপি জশ বাবারিন্ডে পার্লামেন্টের স্ট্যান্ডার্ডস কমিশনার ড্যানিয়েল গ্রিনবার্গের কাছে অভিযোগ পাঠিয়ে জানতে চেয়েছেন, এই অভিযোগ বিদ্যমান তদন্তের সঙ্গে যুক্ত হবে নাকি আলাদা তদন্ত শুরু করা হবে।
অন্যদিকে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির দাবি, ফারাজকে ঘিরে অর্থ গ্রহণের বিতর্ক দিন দিন আরও বড় হচ্ছে।
দলটির এক মুখপাত্র বলেন, "ধনী দাতাদের কাছ থেকে তিনি কত অর্থ বা সুবিধা পেয়েছেন, বিনিময়ে তারা কী পেয়েছেন এবং কেন বিষয়গুলো গোপন রাখা হয়েছে, তার জবাব দিতে হবে।"
ফারাজের বিরুদ্ধে আগেই চলছিল তদন্ত
এর আগেও প্রায় ৫০ লাখ পাউন্ড মূল্যের একটি উপহার গোপন রাখার অভিযোগে ফারাজের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছিল।
ব্রিটিশ-আমেরিকান ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসায়ী ক্রিস্টোফার হারবর্ন ২০২৪ সালে তাকে এই অর্থ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ফারাজের দাবি, এটি রাজনৈতিক অনুদান নয়; ব্যক্তিগত নিরাপত্তার খরচ মেটানোর জন্য দেওয়া হয়েছিল।
বর্তমান অভিযোগের ক্ষেত্রেও ফারাজ একই যুক্তি দিয়েছেন।
কী বলছেন ফারাজ?
রোববার রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে নাইজেল ফারাজ বলেন, তিনি কোনো ধরনের অনিয়ম করেননি এবং সংসদের সব নিয়ম মেনেই কাজ করেছেন।
তিনি বলেন, "আমি কোনো ভুল করিনি। সানডে টাইমস যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তা ভিত্তিহীন। এ বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছি।"
কে এই জর্জ কটরেল?
৩২ বছর বয়সী জর্জ কটরেল দীর্ঘদিন ধরেই ফারাজের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত।
২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ওয়্যার ফ্রড (তারযোগে প্রতারণা) মামলায় দোষ স্বীকার করে তিনি আট মাস কারাদণ্ড ভোগ করেন। অভিযোগ ছিল, ডার্ক ওয়েবের অপরাধীদের অর্থ পাচারে সহায়তার ভান করে প্রতারণার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।
ব্রেক্সিট গণভোটের সময় থেকেও কটরেলকে ফারাজের পাশে নিয়মিত দেখা গেছে। বর্তমানে তিনি ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসার পাশাপাশি একটি অফশোর অনলাইন জুয়ার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যুক্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংসদের নিয়ম কী বলছে?
যুক্তরাজ্যের সংসদীয় বিধিমালা অনুযায়ী, নতুন নির্বাচিত কোনো এমপিকে নির্বাচনের আগের ১২ মাসে পাওয়া নিবন্ধনযোগ্য আর্থিক সুবিধা বা উপহার ঘোষণা করতে হয়।
তবে শুধু ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের কারণে পাওয়া উপহার বা সুবিধা নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতার বাইরে থাকতে পারে।
ফারাজ সংসদ সদস্য হওয়ার পর কটরেলের দেওয়া বেলজিয়াম সফর এবং যুক্তরাষ্ট্রে একটি অভ্যন্তরীণ বিমানের খরচ নিবন্ধন করেছিলেন। কিন্তু সানডে টাইমস যে অতিরিক্ত সহায়তার কথা বলেছে, সেগুলোর কোনো উল্লেখ সংসদের নিবন্ধনে নেই।
এই কারণেই বিষয়টি এখন নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
বিশ্ব থেকে আরো পড়ুন