মাজার বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রশ্ন এটিই, সিলেটের খাদিম পরিবারগুলোর সাথে শাহজালালের কি কোনো রক্তসম্পর্ক ছিল? উত্তর স্পষ্ট। না। প্রথমত শাহজালাল নিজে চিরকুমার অর্থাৎ "মুজাররদ" ছিলেন এবং তাঁর কোনো সন্তান ছিল না।
প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ ০৪:৪২
হযরত শাহজালাল (রহ.) এর দরগা শরীফ
বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু হযরত শাহজালাল (রহ.)। সম্প্রতি তাঁর মাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে দেশজুড়ে যে আলোচনা ও বিতর্ক চলছে, তার প্রকৃত প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে তাঁর জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, আধ্যাত্মিক ধারা এবং উত্তরাধিকারের ইতিহাস বিস্তারিতভাবে জানা জরুরি। এই প্রতিবেদনে বাংলা ও ইংরেজি সূত্র, ঐতিহাসিক পর্যটক বিবরণ এবং পণ্ডিতদের গবেষণার ভিত্তিতে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।
শাহজালালের জন্মস্থান নিয়ে দীর্ঘদিন দুটি ভিন্ন মত প্রচলিত ছিল। প্রচলিত জীবনীগ্রন্থ "সুহাইল-ই-ইয়ামান"-এ তাঁকে ইয়েমেনের বংশোদ্ভূত বলা হয়েছিল। এই গ্রন্থের রচয়িতা সিলেটের প্রাক্তন মুনসিফ নাসিরুদ্দিন, যিনি ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে এটি রচনা করেন। গ্রন্থটি নিজেই দুটি প্রাচীনতর গ্রন্থের সারসংক্ষেপ, যার একটি "রিসালায়ে মুহিউদ্দিন খাদিম" (রচনাকাল ১৭১১) এবং অপরটি রচয়িতা অজ্ঞাত "রওজাত উস সালাতীন" (রচনাকাল ১৭২১)।
কিন্তু বাংলাপিডিয়ার গবেষণা এই তত্ত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে সিলেটে আবিষ্কৃত একটি শিলালিপিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে তিনি ছিলেন "কুনিয়ায়ি", অর্থাৎ তুরস্কের কুনিয়া অঞ্চলের অধিবাসী। এই নির্দিষ্ট শিলালিপিটির সুনির্দিষ্ট আবিষ্কার স্থান বাংলাপিডিয়ার নিবন্ধে স্পষ্টভাবে বিস্তারিত নয়, সেখানে শুধু "সিলেটে আবিষ্কৃত" বলা আছে। এটি গবেষণার একটি সীমাবদ্ধতা।
এটি গুলিয়ে ফেলা উচিত নয় আরেকটি ভিন্ন ফার্সি শিলালিপির সাথে, যা ৯১৮ হিজরি অর্থাৎ ১৫১২ খ্রিস্টাব্দে সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের রাজত্বকালে উৎকীর্ণ হয় এবং যা সিকান্দর শাহ গাজীর ৭০৩ হিজরি অর্থাৎ ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দের সিলেট বিজয়ের তারিখ নিশ্চিত করে। এই শিলালিপিটি শায়খ জালাল মুজাররদ ইবন মুহম্মদের পুণ্য স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত। বাংলাপিডিয়ার মূল্যায়ন অনুযায়ী, ঘটনার দুইশ বছরের সামান্য পরে উৎকীর্ণ করা হলেও এটি নির্ভুল তারিখ প্রদান করে।
গওছীর "গুলজার-ই-আবরার" গ্রন্থেও তাঁকে তুর্কিস্তানি বলা হয়েছে, যা কুনিয়ায়ি তত্ত্বকে সমর্থন করে। এই প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে আধুনিক ইতিহাসবিদরা ইয়েমেন তত্ত্বকে মূলত বাতিল করেছেন, যদিও স্থানীয় জনশ্রুতি ও বহু প্রচলিত জীবনীগ্রন্থ এখনও তাঁকে "শাহজালাল ইয়ামনী" নামে অভিহিত করে। তাঁর পূর্ণ নাম ছিল শেখ শাহজালাল কুনিয়াত মুজাররদ। "মুজাররদ" শব্দটি ব্যবহৃত হতো কারণ তিনি বিবাহ করেননি এবং চিরকুমার জীবন যাপন করেছিলেন।
শাহজালালের কোনো ভাই-বোনের অস্তিত্বের কথা কোনো ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায় না। প্রচলিত জীবনীমূলক বিবরণ অনুযায়ী, তাঁর পিতা ছিলেন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি যিনি জিহাদে শহীদ হন, এবং মাতা তাঁর জন্মের তিন মাসের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করেন। এই দ্রুত পিতামাতা বিয়োগের ঘটনাপ্রবাহে কোনো সহোদর ভাই বা বোনের নাম, ভূমিকা অথবা অস্তিত্বের উল্লেখ কোথাও পাওয়া যায়নি। প্রতিটি জীবনীগ্রন্থই তাঁকে মামা সৈয়দ আহমদ কবিরের একক প্রতিপালিত সন্তান হিসেবে চিত্রিত করে।
সহোদর সম্পর্কে কোনো তথ্যের অনুপস্থিতিকে নিশ্চিত প্রমাণ ধরে নেওয়া পদ্ধতিগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এটি লক্ষণীয় যে এটি একটি নেতিবাচক প্রমাণ অর্থাৎ absence of evidence। তবে শত শত বছরের প্রচলিত জীবনী সাহিত্যে কোনো ভাই-বোনের চিহ্নমাত্র না থাকা একটি জোরালো ইঙ্গিত যে তিনি সম্ভবত একক সন্তান ছিলেন।
মামা সৈয়দ আহমদ কবির কি আপন মামা ছিলেন?
এই প্রশ্নের উত্তরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সুনির্দিষ্ট বংশলতিকা পাওয়া যায়। শাহজালালের মাতামহ ছিলেন সৈয়দ সুররুখ বোখারী, যাঁকে অন্য সূত্রে সৈয়দ জালাল সুরুখ বোখারী নামেও উল্লেখ করা হয়েছে। বিস্তারিত বংশলতিকা অনুসারে এই ব্যক্তির একমাত্র পুত্র ছিলেন সৈয়দ আহমদ কবির, এবং একমাত্র কন্যা ছিলেন হযরত শাহজালালের মাতা সৈয়দা ফাতিমা। অর্থাৎ সৈয়দ আহমদ কবির এবং শাহজালালের মাতা ছিলেন একই পিতার সন্তান, ভাই-বোন। এই হিসেবে আহমদ কবির ছিলেন শাহজালালের মায়ের সহোদর ভাই, যাকে বাংলায় বলা হয় আপন মামা। এটি দূর সম্পর্কের বা সম্মানসূচক সম্বোধন নয়, বরং সরাসরি রক্তসম্পর্কীয় মাতুল সম্পর্ক।
এই তথ্যের সাথে সঙ্গতি রেখে অন্য একাধিক ঐতিহাসিক বিবরণেও বলা হয়েছে যে শাহজালাল তাঁর মাতার দিক দিয়ে এই সৈয়দ বংশীয় প্রখ্যাত দরবেশের দৌহিত্র অর্থাৎ নাতি ছিলেন, এবং আহমদ কবির তাঁর মামা। দুটি তথ্য পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণ, কারণ মাতামহের নাতি হওয়া এবং মামার ভাগিনা হওয়া একই বংশরেখার দুটি স্বাভাবিক ফলাফল। একটি পদ্ধতিগত সতর্কতা হিসেবে বলা প্রয়োজন, এই নির্দিষ্ট বংশলতিকার বিস্তারিত বিবরণ মূলত প্রচলিত জীবনীমূলক সূত্র থেকে পাওয়া, যা সরাসরি বাংলাপিডিয়ার মতো একাডেমিক সম্পাদিত উৎসে যাচাইকৃত নয়। তবে এই বিবরণ একাধিক স্বতন্ত্র সূত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পুনরাবৃত্ত হয়েছে, যা এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়।
শাহজালাল সুফিবাদের সুহরাওয়ার্দী তরিকার অনুসারী ছিলেন। এটি ১২শ শতকে বাগদাদে শিহাবুদ্দীন আবু হাফস উমর আল সুহরাওয়ার্দী প্রতিষ্ঠিত একটি প্রধান সুন্নি সুফি ধারা, যা শরিয়ত পালন ও আধ্যাত্মিক সাধনার সমন্বয়ের ওপর জোর দেয়। সূত্র অনুযায়ী তিনি স্বয়ং শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দীর মুরিদ ও খিদমতে সাত বছর কাটিয়েছিলেন। এই শিষ্যত্বকালে তাঁর সেবাপরায়ণতার একটি বিখ্যাত কাহিনি প্রচলিত। গুরুর বার্ধক্যজনিত কারণে ঠান্ডা খাবার হজমে অসুবিধা হতো বলে শাহজালাল মাথায় জ্বলন্ত চুলা বহন করে বাগদাদ থেকে মক্কা পর্যন্ত গরম খাবার সরবরাহ করতেন।
তাঁর সরাসরি পীর ও পথপ্রদর্শক ছিলেন স্বয়ং মামা সৈয়দ আহমদ কবির সোহরাওয়ার্দি, যিনি নিজেও এই তরিকার একজন প্রতিষ্ঠিত দরবেশ ছিলেন এবং নিজেও প্রসিদ্ধ সাধক শাহ জালালুদ্দিন বুখারীর শিষ্যত্ব লাভ করেছিলেন। তাঁর আধ্যাত্মিক সিলসিলা অর্থাৎ পীর পরম্পরা হযরত মুহাম্মদ সাঃ ও হযরত আলী রাঃ থেকে শুরু করে একাধিক স্তর পেরিয়ে শাহজালাল পর্যন্ত এসে পৌঁছায়।
শাহজালালের সুহরাওয়ার্দী পরিচয় পরবর্তীকালে দক্ষিণ এশিয়ার একটি বড় ধর্মীয় বিতর্কের প্রেক্ষাপটে নতুন তাৎপর্য পায়। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহে ব্রিটিশদের কাছে পরাজয়ের পর ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসা তৈরি হয়, এবং এই প্রেক্ষাপটেই ১৮৬৬ সালে উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার দেওবন্দ নামক স্থানে দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতুবি, যিনি প্রতিষ্ঠাতাদের প্রধান ছিলেন। তাঁর সাথে ছিলেন মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী, মাওলানা ইয়াকুব নানুতুবি এবং সৈয়দ আবিদ হুসাইন। এই কয়েকজন ও আরও দুজন মিলে যে ছয়জন প্রতিষ্ঠাতা ব্যক্তিত্ব, তাদেরকে দেওবন্দি ঐতিহ্যে "আকাবিরে সিত্তাহ" বা ছয় সম্মানিত ব্যক্তি বলা হয়।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, দেওবন্দী আলেমরা সুফিবাদের বিরোধী ছিলেন না। মাওলানা কাসেম নানুতুবি ও মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী দুজনেই হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজির মাক্কির কাছে চিশতী তরিকায় সুফিবাদ শিক্ষালাভ করেছিলেন। তাদের আপত্তি ছিল মূলত মাজার ভিত্তিক রীতি ও পীরের মাধ্যমে সুপারিশ চাওয়ার মতো প্রাতিষ্ঠানিক অনুশীলন নিয়ে, যাকে তারা ধর্মীয় বিচ্যুতি হিসেবে দেখতেন। তবে ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বাড়াবাড়ির মধ্যে তারা স্পষ্ট পার্থক্য করতেন।
এই সংস্কারবাদী প্রবণতার প্রতিক্রিয়াতেই গড়ে ওঠে বারেলভী আন্দোলন, যা পীর ভক্তি ও মিলাদুন্নবী উদযাপনের মতো সুফি রীতিনীতি সংরক্ষণে সচেষ্ট হয়। কাদিরি, চিশতী, নকশবন্দী ও সুহরাওয়ার্দী এই চার প্রধান তরিকার সাথে যুক্ত বহু কোটি অনুসারী এই বারেলভী ধারার অন্তর্গত। সুহরাওয়ার্দী তরিকা ঐতিহাসিকভাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও বংশানুক্রমিক খাদিম প্রথার ওপর গড়ে উঠেছিল, যা বর্তমান সিলেট মাজার বিতর্কের প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ প্রশ্নে নতুন মাত্রা পেয়েছে।
শাহজালালের যাত্রা শুরু হয় আরব দেশ থেকে একাকী, মামার আশীর্বাদ ও এক মুঠো মাটি নিয়ে। সেই মাটির সাথে রঙ ও গন্ধে মিলে যাবে এমন স্থানেই তিনি স্থায়ী আবাস গড়ার নির্দেশ পেয়েছিলেন। "৩৬০ আউলিয়া" কোনো পূর্ব সংগঠিত একক দল ছিল না, বরং দীর্ঘ যাত্রাপথে ক্রমান্বয়ে এই সংখ্যায় পৌঁছায়।
দিল্লি পৌঁছে সেখান থেকে বুরহান উদ্দিনকে নিয়ে ২৪০ জন সঙ্গী সহচরসহ সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা হন। সাতগাঁও ও ত্রিবেণীতে দিল্লির সম্রাট প্রেরিত অগ্রবাহিনীর সিপাহসালার সৈয়দ নাসিরুদ্দীনের সাথে মিলিত হন, এবং নাসিরুদ্দীন নিজেও তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। বিহার প্রদেশে পথে আরও কয়েকজন ধর্মযোদ্ধা যুক্ত হন, যাদের মধ্যে হিসামুদ্দীন ও আবু মোজাফফর উল্লেখযোগ্য। সোনারগাঁওয়ে পৌঁছে সিকান্দর গাজীর সাথে সাক্ষাতের পর সিকান্দর নিজেও তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং সিলেট অভিমুখে যাত্রা করেন। এভাবেই শাহজালালের শিষ্য সংখ্যা বেড়ে ৩৬০ জনে পৌঁছায়।
অর্থাৎ আরব থেকে সিলেট পর্যন্ত দীর্ঘ যাত্রাপথে দিল্লি, বিহার, সাতগাঁও ও সোনারগাঁও এমন বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ক্রমান্বয়ে শিষ্য ও সহযোদ্ধা যুক্ত হয়ে এই সংখ্যায় পৌঁছায়। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী সিকান্দর শাহ গাজী ৭০৩ হিজরি অর্থাৎ ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে সিলেট জয় করেন। এটিই সিলেট আগমনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তারিখ হিসেবে গৃহীত।
বাংলাপিডিয়ার মূল্যায়ন স্পষ্ট। লোককাহিনীর ভিত্তিতে রচিত হলেও কাহিনীটি ঐতিহাসিক সাক্ষ্য দ্বারা সমর্থিত। রাজা গৌর গোবিন্দ, সুলতান শামসুদ্দীন ফিরুজ শাহ, সিকান্দর খান গাজী, নাসিরুদ্দীন ও শাহজালাল এঁরা সবাই ঐতিহাসিক ব্যক্তি। বিস্তারিত বিবরণে কিছু কাল্পনিক উপাদান মিশে থাকতে পারে, তবে মূল ঘটনা অর্থাৎ সিলেট বিজয়ের বিষয়টি সঠিক বলে গৃহীত।
তবে সামরিক নেতৃত্বের প্রকৃতি নিয়ে স্পষ্টীকরণ জরুরি। শাহজালাল নিজে কোনো সেনাপতি ছিলেন না। তিনি ছিলেন আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণাদাতা ও মুসলিম বাহিনীর সাথে যুক্ত আধ্যাত্মিক নেতা। প্রকৃত সামরিক নেতৃত্ব ছিল সুলতান কর্তৃক নিযুক্ত সিকান্দর খান গাজী ও সিপাহসালার নাসিরুদ্দীনের হাতে। দুটি অভিযানে প্রাথমিকভাবে মুসলিম বাহিনী পরাজিত হয়, এবং তৃতীয় দফায় শাহজালাল তাঁর দরবেশ বাহিনীসহ যোগ দিলে যুদ্ধে জয় আসে।
একাডেমিক সতর্কতা হিসেবে উল্লেখযোগ্য, ঔপনিবেশিক আমলের পণ্ডিত ওয়াইজ এই কাহিনীর কালপঞ্জিতে গুরুতর অসঙ্গতি চিহ্নিত করেছেন। যেমন প্রাথমিক বিবরণে শাহজালালের মৃত্যুসাল ৫৯১ হিজরি বলা হলেও, তিনি নিজামুদ্দিন আউলিয়ার (মৃত্যু ৭২৫ হিজরি) সাথে সাক্ষাতের কথাও বলা হয়, যা স্ববিরোধী। এই ধরনের অসঙ্গতি থেকে বোঝা যায় যে ঘটনার মূল কাঠামো ঐতিহাসিকভাবে গৃহীত হলেও এর বিস্তারিত আখ্যান বহু শতাব্দী ধরে মুখে মুখে প্রচারিত হতে হতে কিংবদন্তির রূপ নিয়েছে এবং নির্দিষ্ট তারিখ ও ঘটনাক্রম নিয়ে আধুনিক ইতিহাসবিদদের মধ্যে দ্বিমত আছে।
মরোক্কান পর্যটক ইবনে বতুতা একমাত্র সমসাময়িক পর্যটক যিনি সরাসরি শাহজালালের সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। বাংলাপিডিয়া জানায়, সোনারগাঁওয়ে সুলতান ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের রাজত্বকালে ইবনে বতুতা বাংলায় আসেন এবং ১৩৪৫ থেকে ৪৬ সালের মধ্যে শাহজালালের খানকায় তিনদিন অবস্থান করেন। এই সাক্ষাতের একটি বিস্ময়কর ঘটনা ইতিহাসে সুপরিচিত। ইবনে বতুতা দুই দিনের পথ দূরে থাকতেই শাহজালালের চার শিষ্যের দেখা পান, যাঁরা জানান শেখ তাঁদের অভ্যর্থনার জন্য আগেই পাঠিয়েছেন। অথচ ইবনে বতুতা আগে থেকে কোনো খবর পাঠাননি এবং শাহজালালও তাঁর সম্পর্কে আগে থেকে জানতেন না।
একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষাগত সংশোধনের কথাও বলা প্রয়োজন। ইবনে বতুতা তাঁর সফরনামায় শাহজালালকে "জালালুদ্দীন তাবরিজি" নামে উল্লেখ করেছেন, যা নিয়ে দীর্ঘদিন বিভ্রান্তি ছিল। বাংলাপিডিয়ার গবেষণা ব্যাখ্যা দেয় যে পণ্ডিতদের মতে এটি আসলে "কুনিয়ায়ি" শব্দের ভুল ব্যাখ্যা। ঐতিহাসিক রেকর্ডে প্রকৃত জালালুদ্দীন তাবরিজি নামে একজন সুফি ছিলেন, যিনি মুলতানের শায়খ বাহাউদ্দীন জাকারিয়ার সমসাময়িক এবং শাহজালালের মৃত্যুর প্রায় ১০৩ বছর আগে মৃত্যুবরণ করেন। দুজন জালাল ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই ব্যক্তি, এবং এটি প্রমাণ করে ইবনে বতুতার বর্ণিত ব্যক্তি শাহজালাল নিজেই, ভিন্ন কেউ নন। ইবনে বতুতার বিবরণে শাহজালালকে লম্বা গড়নের, কৃশদেহী, ফর্সা বর্ণের একজন মানুষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ইবনে বতুতার মূল সফরনামার আরবি নাম "রিহলা"। এর প্রামাণ্য ইংরেজি অনুবাদ এইচ এ আর গিব করেছেন, যা রাউটলেজ প্রকাশনা থেকে ১৯২৯ সালে প্রকাশিত এবং পরবর্তীতে বহুবার পুনর্মুদ্রিত হয়েছে।
মাজার বিতর্কের প্রেক্ষাপটে শাহপরাণের সাথে শাহজালালের সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, কারণ সিলেটের দ্বিতীয় বৃহত্তম মাজার তাঁরই নামে। প্রচলিত ও সর্বাধিক গৃহীত বিবরণ অনুযায়ী শাহপরাণ ছিলেন শাহজালালের ভাগিনেয় অর্থাৎ বোনের ছেলে। একাধিক সূত্রে এই সম্পর্ক "আত্মীয় সম্পর্কে বোনের ছেলে" বলা হয়েছে, যা নিকট আত্মীয় হওয়ার পরিচয় দেয়, কিন্তু সরাসরি সহোদর বোনের ছেলে হওয়ার বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত নয়। এই অস্পষ্টতা আগের সেকশনে উল্লেখিত পর্যবেক্ষণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, কারণ শাহজালালের সহোদর ভাই-বোনের কোনো স্বতন্ত্র ও সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই, যদিও তাঁর মামার দিক থেকে আপন রক্তসম্পর্ক স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত।
শাহপরাণের বংশলতিকা অনুযায়ী তাঁর পূর্বপুরুষরা ছিলেন বোখারা শহরের অধিবাসী। তাঁর ঊর্ধ্বতন চতুর্থ পুরুষ বোখারা থেকে সমরকন্দ ও পরে তুর্কিস্তানে এসে বসবাস করেন। এই তুর্কিস্তান যোগসূত্র শাহজালালের তুর্কি অথবা কুনিয়া বংশোদ্ভবের তত্ত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ১১ বছর বয়সে পিতৃহারা হওয়ার পর শাহপরাণ মামা সৈয়দ আহমদ কবিরের কাছে ধর্মশিক্ষা গ্রহণ করেন। অর্থাৎ তিনিও শাহজালালের মতোই একই মুর্শিদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
শাহজালাল ভারতবর্ষে ধর্মপ্রচারের যাত্রা শুরু করলে শাহপরাণ মামার সাথে যোগ দেন। সিলেট বিজয়ের পর তাঁকে শাহজালালের নির্দেশে সিলেট শহর থেকে কয়েক মাইল দূরবর্তী খাদিমনগর এলাকায় ধর্মপ্রচারের জন্য পাঠানো হয়, যেখানে তিনি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কাজ করেন এবং সেখানেই সমাধিস্থ হন।
খাদিমের দায়িত্ব ছিল মূলত মাজার তত্ত্বাবধান ও অতিথি সেবা। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল দরগাহ প্রাঙ্গণ পরিচালনা, লঙ্গরখানা অর্থাৎ ভোজনশালা চালানো এবং জিয়ারতে আসা দর্শনার্থীদের সেবা করা। উল্লেখযোগ্য, খাদিমদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ভূমিকাও ছিল। দিল্লির রাজপুরুষগণ যখন সিলেটের শাসনকর্তা নিযুক্ত হতেন, প্রথা অনুযায়ী শাসনভার গ্রহণের আগে দরগাহে এসে জিয়ারত করে কার্যভার গ্রহণ করতেন। এই প্রথা ব্রিটিশ শাসনের প্রারম্ভকাল পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। অর্থাৎ খাদিমরা শাসকদের বৈধতা দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতায় গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণকারী ছিলেন।
সিলেট বিজয়াভিযানে হাজী মুহাম্মদ ইউসুফ ছিলেন শাহজালালের ঘনিষ্ঠ সহচরদের একজন। যখন শাহজালাল সিলেটে স্থায়ী আবাস স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁর সঙ্গে থেকে যান শাহজাদা ইয়ামানি, হাজী ইউসুফ এবং হাজী খলিল, এবং বাকি দরবেশরা সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে ফিরে যান। তাঁর পূর্বপুরুষের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক উৎস নিয়ে বিস্তারিত জীবনীমূলক বিবরণ পাওয়া যায়নি। উপলব্ধ সূত্রগুলো তাঁকে শুধু "শাহজালালের নিকটতম সহচর" হিসেবেই চিহ্নিত করে।
মাজার বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রশ্ন এটিই, সিলেটের খাদিম পরিবারগুলোর সাথে শাহজালালের কি কোনো রক্তসম্পর্ক ছিল?
উত্তর স্পষ্ট। না। প্রথমত শাহজালাল নিজে চিরকুমার অর্থাৎ "মুজাররদ" ছিলেন এবং তাঁর কোনো সন্তান ছিল না। দ্বিতীয়ত ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী শাহজালাল মৃত্যুর পূর্বে তাঁর নিকটতম সহচর হাজী মুহাম্মদ ইউসুফকে তাঁর দরগাহর খাদিম নিযুক্ত করেন, এবং ইউসুফের বংশধর, আজকের সারেকাউম পরিবার, এই খাদিমের ভূমিকা বংশানুক্রমে অব্যাহত রেখেছে। অর্থাৎ বর্তমান খাদিম পরিবারগুলোর বংশসূত্র শাহজালালের নিজের রক্তধারা থেকে নয়, বরং তাঁর সহচর ও সফরসঙ্গীদের বংশধারা থেকে এসেছে।
এই তথ্যকে সমর্থন করে দরগাহ প্রাঙ্গণের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ। দরগাহর দক্ষিণ দিকের প্রবেশপথে হাজী ইউসুফ, হাজী খলিল ও হাজী দরিয়া নামক তিন অলির সমাধি বিদ্যমান, এবং পাশেই দরগাহের প্রাক্তন মোতওয়াল্লী আবু তুরাবের কবর রয়েছে। সংক্ষেপে বলা যায়, খাদিম পরিবারগুলোর দাবি করা "৭০০ বছরের ঐতিহ্যগত অধিকার" ঐতিহাসিকভাবে সঠিক হতে পারে, কিন্তু এটি শাহজালালের রক্তসম্পর্কীয় উত্তরাধিকার নয়। এটি বরং তাঁর সহচর ও অনুসারীদের বংশানুক্রমিক সেবা দায়িত্বের উত্তরাধিকার।
শাহজালালের অর্থনৈতিক জীবনদর্শন সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাহিনি প্রচলিত আছে, যা তাঁর তাওয়াক্কুল অর্থাৎ আল্লাহর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতার দর্শন স্পষ্ট করে। স্থানীয় শাসনকর্তা একবার গোপনে তাঁর খাদিমের মাধ্যমে কিছু স্বর্ণমুদ্রা পাঠিয়েছিলেন, এই শর্তে যে শাহজালাল জানতে পারবেন না অর্থের উৎস। কিন্তু খাদিম এই গোপনীয়তা রক্ষা না করে শায়খকে সব জানিয়ে দেন। শাহজালাল তখন নির্দেশ দেন, লোকটি যেখানে যেখানে পা ফেলেছিল, সেই মাটি খুঁড়ে স্বর্ণমুদ্রাগুলো ফেলে দিতে। এই কাহিনি থেকে স্পষ্ট, তিনি বাহ্যিক অনুদান ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করতেন।
মৃত্যুর সঠিক তারিখ নিয়ে সূত্রভেদে অমিল রয়েছে। কোনো সূত্রে ১৩৪০, কোনোটিতে ১৩৪১, আবার ইবনে বতুতার বিবরণ অনুসারী সূত্রে ৭৪৬ হিজরি অর্থাৎ ১৫ মার্চ ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দ। তবে সবগুলো সূত্র একমত যে তাঁকে সিলেটেই, তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠিত আস্তানায় দাফন করা হয়, যা আজকের দরগাহ শরীফ।
এই ঐতিহাসিক পর্যালোচনা বর্তমান মাজার ব্যবস্থাপনা বিতর্ক বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিকোণ দেয়। একদিকে এটা স্পষ্ট যে মাজার তত্ত্বাবধানের প্রথা প্রতিষ্ঠার সূচনা থেকেই বিদ্যমান। শাহজালাল নিজেই তাঁর সহচর হাজী ইউসুফকে খাদিম নিযুক্ত করেছিলেন, এবং তিনি নিজে সুহরাওয়ার্দী তরিকার একজন কঠোর তাওয়াক্কুলপন্থী সাধক ছিলেন যিনি বাহ্যিক অর্থ পৃষ্ঠপোষকতা প্রত্যাখ্যান করতেন। অন্যদিকে খাদেম পরিবারগুলোর "৭০০ বছরের ঐতিহ্যগত অধিকার" দাবি ঐতিহাসিকভাবে যৌক্তিক হলেও তা রক্তসম্পর্কীয় উত্তরাধিকার নয়। এটি বরং সেবা দায়িত্বের বংশানুক্রমিক ধারাবাহিকতা, যা আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্ন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
ফলে এই বিতর্কে উভয় পক্ষের যুক্তিরই একটা আংশিক ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সমাধানের জন্য প্রয়োজন আরও গভীর একাডেমিক গবেষণা, যা মূল ফার্সি ও আরবি সুফি জীবনীগ্রন্থ এবং স্থানীয় মৌখিক ইতিহাসের তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সম্ভব।
তথ্যসূত্র:
১. ইসলাম, সিরাজুল ও অন্যান্য (সম্পাদনা), "শাহ জালাল (রঃ)", বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ, ২য় সংস্করণ, বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ২০১২। bn.banglapedia.org
২. Ibn Battuta, Rihla, আরবি মূল, ১৪শ শতক। ইংরেজি অনুবাদ: H.A.R. Gibb, Ibn Battuta: Travels in Asia and Africa, 1325 1354, Routledge, London, 1929
৩. Gulzar i Abrar of Ghausi, Journal of the Asiatic Society of Pakistan, খণ্ড II, ১৯৫৯
৪. নাসিরুদ্দিন, সুহাইল ই ইয়ামান, ১৮৫৯। ভিত্তি গ্রন্থ রিসালায়ে মুহিউদ্দিন খাদিম (১৭১১) ও রওজাত উস সালাতীন (১৭২১)
৫. Muhammad Enamul Haq, A History of Sufism in Bengal, Dhaka, 1975
৬. Abdul Karim, Social History of the Muslim in Bengal, 2nd ed., Chittagong, 1985
৭. অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি, শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত, ২য় খণ্ড, উৎস প্রকাশনা, ২০০২
৮. মুফতী আজহারউদ্দীন আহমাদ সিদ্দিকী, শ্রীহট্টে ইসলামের জ্যোতি, উৎস প্রকাশনা, ২০০২
৯. শাহ জালাল, সিলেট বিজয় ও দারুল উলুম দেওবন্দ, উইকিপিডিয়া বাংলা। bn.wikipedia.org
১০. শাহ পরাণের মাজার, উইকিপিডিয়া বাংলা। bn.wikipedia.org
১১. সিলেট জেলা প্রশাসন ও সিলেট সদর উপজেলা ওয়েবসাইট। sylhet.gov.bd এবং sylhetsadar.sylhet.gov.bd
ধর্ম থেকে আরো পড়ুন