বাংলাদেশ

হামে মৃত্যুর মিছিল

ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারছে না সরকার

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ ০৩:০৭

গ্রাফিক্স: বায়ান্ননিউজ

দেশজুড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে হাম পরিস্থিতি। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন পর্যন্ত হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে মারা গেছে ৪৬৪ জন। এর মধ্যে ৭৫ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হামে এবং বাকি ৩৮৯ জনের মৃত্যু হামের উপসর্গ নিয়ে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু স্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতারও ভয়াবহ উদাহরণ। দীর্ঘদিন টিকাদান কার্যক্রমে গাফিলতি, ভ্যাকসিন সংকট, নীতিগত অস্থিরতা এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার ফল এখন প্রাণ দিয়ে দিচ্ছে দেশের শিশুরা।

“দায় কার?” প্রশ্নে রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি

বর্তমান সরকার সরাসরি দায় চাপাচ্ছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর। সরকারের দাবি, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিয়মিত হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং টিকা সংগ্রহে সিদ্ধান্তহীনতার কারণেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার অভিযোগ করেছেন, আগের সরকারের সময়ে টিকার কাভারেজ নিয়ে “ডেটা টেম্পারিং” হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ে টিকা কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও দাবি করেছেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশে পর্যাপ্ত হামের টিকা ছিল না। তার ভাষায়, “২০২০ সালের পর কার্যত কোনও কার্যকর জাতীয় ক্যাম্পেইন হয়নি।”

তবে জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, আগের সরকারের ব্যর্থতা থাকলেও বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এতদিন কী করেছে?

মৃত্যু বাড়লেও প্রস্তুতি ছিল না

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব কয়েক মাস ধরেই বাড়ছিল। কিন্তু সময়মতো জরুরি পদক্ষেপ না নেওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীর চাপ বাড়লেও অনেক এলাকায় আইসোলেশন ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত বেড বা চিকিৎসা সহায়তা ছিল না।

অনেক জেলায় এখনও হাম পরীক্ষার পর্যাপ্ত সুবিধা নেই। ফলে প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।

টিকা কেনা নিয়েও বিতর্ক

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনা নিয়ে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছিল। ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনার বদলে উন্মুক্ত টেন্ডারের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় পুরো প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

বর্তমান সরকার দাবি করছে, তারা দায়িত্ব নেওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে টিকা সংগ্রহ করে নতুন ক্যাম্পেইন শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত এক কোটি ৮২ লাখের বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।

তবে সমালোচকরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার পর তড়িঘড়ি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা আগে করলে এত প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব ছিল।

পুষ্টিহীনতা ও দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু টিকার অভাব নয়, শিশুদের পুষ্টিহীনতাও মৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ। হামে আক্রান্ত অনেক শিশু পরে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে এবং সেখানেই মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন, পুষ্টির ঘাটতির কারণে শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, যেসব এলাকায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালানো হয়েছে সেখানে সংক্রমণ কমতে শুরু করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, টিকা কার্যক্রম নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদি না হলে পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহ হতে পারে।

জনমনে ক্ষোভ

দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা তীব্র হচ্ছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে এত শিশুর মৃত্যু কীভাবে ঘটলো?

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক দোষারোপ নয়, এখন প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, দীর্ঘমেয়াদি টিকানীতি এবং জরুরি স্বাস্থ্যব্যবস্থার পুনর্গঠন। তা না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন