বিশ্ব

ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টিতে তীব্র বিদ্রোহ, স্টারমারের পদত্যাগ দাবিতে ৮০ এমপি

মন্ত্রীদের পদত্যাগ, ক্যাবিনেটে বিভক্তি, নেতৃত্ব পরিবর্তনের জোর আলোচনা

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ ২১:১৫

ছবি: বিবিসি

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে ঘিরে লেবার পার্টিতে নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। স্থানীয় নির্বাচন ও স্কটল্যান্ড-ওয়েলসের ভোটে ভরাডুবির পর দলটির ভেতরে প্রকাশ্য বিদ্রোহ শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৮০ জনের বেশি লেবার এমপি স্টারমারের পদত্যাগ অথবা সরে যাওয়ার সময়সূচি ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন।

মঙ্গলবার পরিস্থিতি আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে, যখন সরকারের সেফগার্ডিংবিষয়ক মন্ত্রী জেস ফিলিপস পদত্যাগ করেন। পদত্যাগপত্রে তিনি স্টারমারকে উদ্দেশ করে বলেন, “দেশ এখন কথার চেয়ে কাজ দেখতে চায়। শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পরিবর্তন দরকার।”

একই দিনে আরও দুইজন জুনিয়র মন্ত্রী পদ ছাড়েন। ব্রিটিশ গণমাধ্যম জানিয়েছে, লেবার সরকারের ভেতরে আরও কয়েকজন মন্ত্রী পদত্যাগের প্রস্তুতিতে রয়েছেন।

কেন এত চাপে স্টারমার?

গত সপ্তাহের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে লেবারের ভয়াবহ ফলের পর থেকেই সংকট শুরু হয়। ইংল্যান্ডে দলটি প্রায় ১,৫০০ কাউন্সিলর হারিয়েছে। ওয়েলসে শত বছরের আধিপত্য ভেঙে ক্ষমতা হারিয়েছে দলটি। স্কটল্যান্ডেও ইতিহাসের অন্যতম খারাপ ফল করেছে লেবার।

বিশেষ করে নাইজেল ফারাজের রিফর্ম ইউকের উত্থান এবং লন্ডনে গ্রিন পার্টির শক্তিশালী অবস্থান লেবারের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দলের ভেতরের অনেক এমপির অভিযোগ, স্টারমার সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলেছেন এবং অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও অভিবাসন ইস্যুতে কার্যকর নেতৃত্ব দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন।

ক্যাবিনেটেও বিভক্তি

বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী স্টারমারকে সরে যাওয়ার সময়সূচি ঘোষণা করার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে মন্ত্রিসভার আরেকটি অংশ এখনই নেতৃত্ব পরিবর্তনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

রাজনৈতিক সম্পাদক ক্রিস ম্যাসন বলেছেন, “ক্যাবিনেট এখন মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। একদল মনে করছে স্টারমারকে বাঁচাতে হবে, আরেকদল মনে করছে পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন নেতৃত্ব দরকার।”

স্টারমার কী বলছেন?

মঙ্গলবার সকালে ডাউনিং স্ট্রিটে মন্ত্রিসভার বৈঠকে স্টারমার স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না।

তিনি বলেন,
“আমি সরকার পরিচালনার কাজ চালিয়ে যাবো। সন্দেহকারীদের ভুল প্রমাণ করবো।”

স্টারমার দাবি করেন, সরকার কিছু ভুল করলেও “বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো সঠিক” ছিল।

নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়া কী?

লেবার পার্টির নিয়ম অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ শুরু করতে হলে দলটির অন্তত ২০ শতাংশ এমপির সমর্থন প্রয়োজন। বর্তমানে লেবারের ৪০৩ জন এমপি রয়েছে। অর্থাৎ নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য কমপক্ষে ৮১ জন এমপির সমর্থন লাগবে।

বর্তমানে প্রকাশ্যে স্টারমারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এমপির সংখ্যা ৮০ ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি। ফলে আর মাত্র কয়েকজন এমপি প্রকাশ্যে অবস্থান নিলেই আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব সংকট শুরু হতে পারে।

কারা হতে পারেন নতুন নেতা?

লেবার পার্টির সম্ভাব্য নতুন নেতা হিসেবে কয়েকটি নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে—স্বাস্থ্য সচিব ওয়েস স্ট্রিটিং, সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনার, গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম

তবে এখন পর্যন্ত কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেননি।

ওয়েস স্ট্রিটিং মঙ্গলবার সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে যান, যা রাজনৈতিক মহলে নতুন জল্পনা তৈরি করেছে।

জেস ফিলিপসের পদত্যাগ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

জেস ফিলিপস দীর্ঘদিন ধরে লেবারের জনপ্রিয় ও স্পষ্টভাষী নেত্রী হিসেবে পরিচিত। তিনি নারীর নিরাপত্তা, গার্হস্থ্য সহিংসতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে কাজের জন্য পরিচিত।

তাই তার পদত্যাগকে শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং স্টারমারের নেতৃত্বের প্রতি বড় রাজনৈতিক অনাস্থা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

স্টারমারের পাশে কারা?

সংকটের মধ্যেও স্টারমারের সমর্থনে প্রকাশ্যে এগিয়ে এসেছেন শতাধিক লেবার এমপি। তারা যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন—

“এখন নেতৃত্ব পরিবর্তনের সময় নয়। দেশের আস্থা ফেরাতে দলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।”

কয়েকজন মন্ত্রীও বলেছেন, নেতৃত্ব পরিবর্তন করলে সরকার আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে।

এখন কী হতে পারে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েকদিন স্টারমারের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যদি আরও এমপি প্রকাশ্যে বিদ্রোহে যোগ দেন, তাহলে আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ শুরু হতে পারে। অন্যদিকে স্টারমার পরিস্থিতি সামাল দিতে বড় ধরনের মন্ত্রিসভা পরিবর্তন বা নতুন নীতিগত ঘোষণা দিতে পারেন বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

বর্তমানে ডাউনিং স্ট্রিট ও লেবার পার্টির ভেতরে চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। ব্রিটিশ রাজনীতিতে এটি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় নেতৃত্ব সংকটগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্ব থেকে আরো পড়ুন