বিশ্ব

ইরানে কি ইরাকের প্রতিচ্ছবি ঘটাতে যাচ্ছেন ট্রাম্প

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ০২:৫০

মার্কিন কংগ্রেসে দাঁড়িয়ে ২০০৩ সালের শুরুতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাককে বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তার বক্তব্যে ছিল গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অভিযোগ, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা এবং আগাম পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা। সেই ভাষণের কয়েক মাসের মধ্যেই শুরু হয় যুদ্ধ, যার দীর্ঘ ছায়া এখনো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে রয়ে গেছে।

দুই দশকেরও বেশি সময় পর একই কংগ্রেসে দাঁড়িয়ে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেছেন ইরান–এর পারমাণবিক কর্মসূচিকে। তার দাবি, তেহরান দ্রুত এমন সক্ষমতার দিকে এগোচ্ছে যা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

প্রশ্ন উঠছে, এটি কি কেবল কূটনৈতিক চাপ, নাকি বড় সামরিক সিদ্ধান্তের পূর্বাভাস?

ভয় ও ভাষণের রাজনীতি

ইরাক যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রে জনমত গঠনের জন্য ভয়কে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। সম্ভাব্য পারমাণবিক হামলার চিত্র তুলে ধরে জনগণের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা হয়েছিল। পরে দেখা যায়, সেই তথ্যের বড় অংশই সঠিক ছিল না।

ইরান প্রসঙ্গে এবারও একই ধরনের হুমকির ভাষা শোনা যাচ্ছে। অভিযোগ করা হচ্ছে, দেশটি মাটির গভীরে গোপন স্থাপনায় পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। তবে প্রশাসনের ভেতর থেকেই ভিন্নধর্মী বক্তব্য সামনে আসছে। একদিকে দাবি করা হচ্ছে আগের সামরিক অভিযানে ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো ভেঙে দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে বলা হচ্ছে দেশটি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

এই সাংঘর্ষিক অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

সামরিক প্রস্তুতি না কূটনৈতিক কৌশল

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ ও বিমান শক্তির উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সামরিক মহড়া ও ঘাঁটিগুলোতে প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। একই সময়ে পর্দার আড়ালে চলছে আলোচনা।

এ ধরনের দ্বিমুখী কৌশল নতুন নয়। আলোচনার টেবিলে চাপ সৃষ্টি করতে সামরিক উপস্থিতি ব্যবহার করা হয় প্রায়ই। কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে, একবার উত্তেজনা বাড়তে শুরু করলে সেটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

ইরাক যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড় করেছিল। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। ইউরোপীয় দেশগুলোর অনেকে সরাসরি সামরিক জড়ানোর বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ফলে সম্ভাব্য যে কোনো অভিযানে ওয়াশিংটনকে অনেকটাই একক অবস্থানে থাকতে হতে পারে।

শাসন পরিবর্তনের জটিল সমীকরণ

ইরাক যুদ্ধের অন্যতম বড় ভুল ছিল যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতার জন্য প্রস্তুতির অভাব। সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর দেশটিতে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়, যা দ্রুত গৃহসংঘাত ও দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতায় রূপ নেয়।

ইরান ইরাকের তুলনায় আরও বৃহৎ, জনবহুল এবং রাজনৈতিকভাবে জটিল রাষ্ট্র। সেখানে শাসন কাঠামো ভেঙে পড়লে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হবে, তার পরিষ্কার রূপরেখা এখনো সামনে আসেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি হঠাৎ করে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয়, তাহলে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এতে শুধু একটি দেশের নয়, পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা প্রশ্নের মুখে পড়বে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মতভেদ

ওয়াশিংটনের ভেতরেও একমত নয় সবাই। প্রশাসনের একটি অংশ বলছে, লক্ষ্য কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা। অন্য অংশ মনে করে, কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া ইরানকে থামানো যাবে না।

এই মতপার্থক্য নীতিগত অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। একদিকে সামরিক প্রস্তুতি, অন্যদিকে কূটনৈতিক বার্তা—এই দ্বৈত অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

আঞ্চলিক উত্তেজনার বিস্তার

ইরান ইস্যুর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিও অস্থির। সম্প্রতি পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্তে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই ধরনের সংঘাত প্রমাণ করে, পুরো অঞ্চলই এখন উত্তেজনার প্রান্তে দাঁড়িয়ে।

যদি বড় শক্তিগুলোর সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, তাহলে তার প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে আরও বিস্তৃত হতে পারে।

সামনে কোন পথ

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন—কূটনীতি কি শেষ পর্যন্ত সফল হবে? নাকি কঠোর ভাষণ ও সামরিক প্রস্তুতি শেষ পর্যন্ত সংঘাতের পথেই নিয়ে যাবে?

ইতিহাস বলছে, সামরিক পদক্ষেপ শুরু হলে তার নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। আর ভুল তথ্য বা অতিরঞ্জিত আশঙ্কা বড় সিদ্ধান্তের ভিত্তি হলে তার মূল্য চুকাতে হয় বহু বছর ধরে।

ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান তাই শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় বিরোধ নয়। এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

এখন বিশ্ব তাকিয়ে আছে—সমঝোতার পথে এগোবে ওয়াশিংটন ও তেহরান, নাকি নতুন এক সংঘাতের অধ্যায় শুরু হবে।

বিশ্ব থেকে আরো পড়ুন