আইরিন খান:
মূল সংস্কার কার্যক্রম তুলে ধরে একটি বই প্রকাশ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। রোববার এই বই প্রকাশ করা হয় বলে জানিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।
প্রেস উইং জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসা লাখ লাখ মানুষের সাহস ও প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়। দীর্ঘ প্রায় ষোল বছর ধরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চলা ফ্যাসিবাদী দমন নীতির অবসান ঘটিয়ে জুলাই আন্দোলনের পথ ধরে গঠিত হয় প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। দায়িত্ব গ্রহণের সময় রাষ্ট্র গভীর অর্থনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিক ও গণতান্ত্রিক সংকটে নিমজ্জিত ছিল।
বইয়ে উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও দুঃশাসনের ফলে রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে পড়ে। সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল অর্থ পাচার হয়। ব্যাংকিং খাত অকার্যকর ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়ে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থের অধীন হয়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজনৈতিক দমন পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং বিচার বিভাগ দুর্নীতি ও প্রভাবের কবলে পড়ে। এর ফলে নাগরিক অধিকার সংকুচিত হয় ভোটারবিহীন নির্বাচন নিয়মে পরিণত হয় এবং গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের অংশগ্রহণে সংস্কার কার্যক্রম শুরু করে। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই খাতভিত্তিক সংস্কারের জন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এসব কমিশনের সুপারিশ এবং সরকারের নিজস্ব উদ্যোগে ব্যাপক আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়।
প্রেস উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের পর ১৮ মাসে সরকার প্রায় ১৩০টি আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করেছে এবং ৬০০টির বেশি নির্বাহী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের প্রায় ৮৪ শতাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে যা কাগুজে পরিবর্তনের বাইরে বাস্তব সংস্কারের প্রতিফলন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা জানানো হয়। নতুন বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে বাজার বৈচিত্র্য আনা হয়েছে। জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির ফলে প্রায় ৭ হাজার ৪০০ পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার মিলেছে। চীনের সঙ্গে সহযোগিতায় ঋণের মেয়াদ বৃদ্ধি স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থায় অগ্রগতি এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন ভারসাম্যপূর্ণ ভিত্তিতে পুনর্গঠিত হয়েছে।
বইয়ে বলা হয়, জবাবদিহির প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। শত শত রাজনীতিবিদ ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা হয়েছে এবং বিপুল সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে কার্যকর তদারকি চালু হয়েছে। ৪২টি মন্ত্রণালয়ে ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কারের অংশ হিসেবে তদন্তাধীন এক হাজারের বেশি কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং মানবাধিকারভিত্তিক প্রশিক্ষণ চালু করা হয়েছে। র্যাব পুনর্গঠন করে এর নাম পরিবর্তন করে স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স রাখা হয়েছে। বিশেষ কমিশনের মাধ্যমে হাজার হাজার ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য গ্রহণ করে সত্য ও জবাবদিহির দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বিচার বিভাগ সংস্কারের মাধ্যমে আদালতের ওপর নির্বাহী নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে মেধাভিত্তিক প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং আগে নিষিদ্ধ থাকা গণমাধ্যমগুলোকে পুনরায় কার্যক্রম চালুর অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপও পরিচালনা করেছে। সাত মাসব্যাপী এই আলোচনা জাতীয়ভাবে সম্প্রচারিত হয় এবং এর ফল হিসেবে জুলাই সনদ প্রণীত হয়। সাংবিধানিক সংস্কারের ভিত্তি হিসেবে এই সনদ এখন গণভোটের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রেস উইং জানায়, এই সংস্কার কার্যক্রম একটি নতুন শাসন ব্যবস্থার সূচনা মাত্র। ষোল বছরের ক্ষতি ১৮ মাসে পূরণ করা সম্ভব নয়। তবে বাংলাদেশ কর্তৃত্ববাদী শাসন থেকে সরে এসে গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে গেছে। জুলাই ও আগস্টে জনগণের সাহসী অবস্থানই এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন