ইতিহাস ও ঐতিহ্য

তেরশ্রী গণহত্যার ৫৪ বছর

প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০২৫ ০৪:৩০

তেরশ্রী স্মৃতিসৌধ

গোলাম রসুল খান: আজ ভয়াল ২২ নভেম্বর। মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার তেরশ্রী গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকার ও আলবদরদের হাতে সংঘটিত ভয়াবহ গণহত্যার দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে বর্বর হামলায় শহীদ হয়েছিলেন তেরশ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমানসহ নিরীহ ৪৩ জন গ্রামবাসী। স্বাধীনতার শেষ প্রহরে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ড এখনও মানিকগঞ্জের মানুষের স্মৃতিতে গেঁথে আছে রক্তাক্ত অধ্যায়ের মতো।

মানিকগঞ্জের ইতিহাসবিষয়ক গবেষক সাইফ উদ্দিন আহম্মেদ সম্পাদিত “মানিকগঞ্জের ইতিহাস” গ্রন্থ থেকে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে তেরশ্রী ছিল মুক্তিবাহিনীর শক্ত ঘাঁটি। হানাদার বাহিনীর জন্য এলাকাটি ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের দমনে তারা পরিকল্পিতভাবে তেরশ্রী দখলের সিদ্ধান্ত নেয়। পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ২২ নভেম্বর শেষ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী গ্রামটিতে হঠাৎ অভিযান চালায়।

গ্রামে ঢুকে প্রথমেই আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বাড়িঘরে। অগ্নিকুণ্ডে আতঙ্কগ্রস্ত মানুষ ঘর থেকে বের হয়ে আসতেই শুরু হয় নির্বিচার গুলি বর্ষণ। যারা পালানোর চেষ্টা করেছিলেন, তাদের অনেককে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। ভোররাতে পুরো গ্রামে শুধু আগুন, ধোঁয়া এবং মানুষের আর্তচিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, সেই মুহূর্তে গ্রামজুড়ে মানুষের পোড়া গন্ধ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল।

এই হামলায় শহীদ ৪৩ জনের মধ্যে ছিলেন অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমান এবং গ্রামটির জমিদার পরিবারের সদস্য সিদ্ধেশ্বরীর উত্তরসূরি প্রসাদ চৌধুরী। পাকিস্তানি বাহিনী তাদের প্রকাশ্য দিবালোকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। নিহত অনেকের পরিচয় এখনো কবরস্ত স্মৃতিচিহ্নে স্মরণীয় হয়ে আছে।

ত্রাসের সেই দিনটিকে স্মরণে রাখতে মানিকগঞ্জ ঘিওর টাঙ্গাইল মহাসড়কের তেরশ্রী এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিফলক। প্রতি বছর ২২ নভেম্বর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আয়োজন করা হয় শোভাযাত্রা, পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং আলোচনা সভা। ঘিওর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাশিতা তুল ইসলাম জানিয়েছেন, এ বছরও রাষ্ট্রীয় সম্মানের দাবিতে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা বজায় রয়েছে।

যদিও মানিকগঞ্জবাসী দিনটি প্রতি বছর পালন করে আসছে, তবু এখনো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তেরশ্রী গণহত্যা দিবসের কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়া যায়নি। গবেষকরা মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তেরশ্রী গণহত্যা বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। তাই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি জরুরি।

১৯৭১ সালের অন্যান্য গণহত্যার মতোই তেরশ্রীর নিরীহ মানুষরা স্বাধীনতার পথে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। আজ তাদের আত্মদান স্মরণে আবারও কেঁপে ওঠে ইতিহাস।

বায়ান্ননিউজ২৪ /এডিটর ইন চীফ 

ইতিহাস ও ঐতিহ্য থেকে আরো পড়ুন