প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ০২:৪৬
রোহিঙ্গা শিবিরে রোহিঙ্গা নেতাদের সাথে কথা বলছেন জাতিসংঘ মহাসচিব ও প্রফেসর ইউনুস
‘আগামী ঈদ মিয়ানমারে’—এই একটি বাক্য কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে থাকা রোহিঙ্গাদের মনে নতুন করে স্বপ্ন জাগিয়েছিল। দীর্ঘ আট বছরের অপেক্ষার শেষে হয়তো তারা নিজ ভূমিতে ফিরতে পারবেন—এমন আশ্বাস দিয়েছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। কিন্তু সময় গড়িয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষের পথে, সামনে আরেকটি ঈদ। বাস্তবতা হলো, রোহিঙ্গারা এখনো কাঁটাতার ঘেরা শিবিরেই রয়ে গেছেন।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই ড. ইউনূস জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে সঙ্গে নিয়ে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে যান। ইফতারের টেবিলে দাঁড়িয়ে দেওয়া সেই বক্তব্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচিত হয়। নোবেলজয়ী পরিচিতি ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার কারণে অনেকেই ভেবেছিলেন, রোহিঙ্গা সংকটে হয়তো নতুন কোনো গতি আসবে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়জুড়েই প্রত্যাবাসন নিয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। বরং নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট আবারও নীতিনির্ধারকদের অগ্রাধিকার তালিকার নিচে নেমে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উখিয়ার কুতুপালং শিবিরের বাসিন্দা আবদুস সালামের ভাষায়, “আমরা সত্যিই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। মনে হয়েছিল, এবার হয়তো ঘরে ফিরব। এখন বুঝছি, কথাটা শুধু আশ্বাসই ছিল।”
রোহিঙ্গাদের কাছে ঈদ মানে এখন আর উৎসব নয়। বরং বাঁশ আর ত্রিপলের ঘরে আরেকটি বছর পার করার বেদনা। নতুন প্রজন্মের অনেকেই বাংলাদেশে জন্মেছে, বড় হয়েছে। তাদের কাছে মিয়ানমার একদিকে স্মৃতির দেশ, অন্যদিকে অচেনা বাস্তবতা।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, ইউনূস সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল প্রত্যাশা তৈরি করে তা পূরণে কোনো কার্যকর কূটনৈতিক বা নীতিগত রোডম্যাপ না দেখানো। আন্তর্জাতিক সম্মেলন, বৈঠক আর বিবৃতির বাইরে গিয়ে বাস্তবসম্মত কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা গবেষকদের মতে, প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য ছিল দায়িত্বশীল অবস্থানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে এমন স্পষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করে কথা বলা বাস্তবসম্মত ছিল না।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই বক্তব্য ছিল হয়তো আবেগী জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা, নয়তো সংকটের জটিলতা সম্পর্কে বাস্তব উপলব্ধির ঘাটতির প্রতিফলন। যে কোনো ক্ষেত্রেই এর ফল ভুগতে হচ্ছে রোহিঙ্গাদের।
পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি ছিল ‘প্রত্যাশা’, কোনো প্রতিশ্রুতি নয়। কিন্তু শিবিরে থাকা মানুষের কাছে সেই ব্যাখ্যা অর্থহীন। কারণ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল ব্যক্তির মুখ থেকে আসা কথাকে তারা প্রতিশ্রুতি হিসেবেই নিয়েছিলেন।
বর্তমানে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে কোনো কার্যকর ও বৈধ সরকার নেই। নতুন করে সংঘাত, সামরিক অস্থিরতা ও নিপীড়নের কারণে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ আরও জটিল হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থাও বলছে, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ন্যূনতম শর্ত এখনো পূরণ হয়নি।
এর মধ্যে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। খাদ্য, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে শিবিরগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে, আর আন্তর্জাতিক সহায়তাও কমছে।
সমালোচকদের মতে, ইউনূস সরকার রোহিঙ্গা সংকটকে মানবিক আবেগ দিয়ে উপস্থাপন করলেও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। জাতীয় নীতিমালা, প্রতিনিধিত্বমূলক কাঠামো বা সুস্পষ্ট কূটনৈতিক রূপরেখা—কোনোটিই সামনে আসেনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যায় শেষ হতে যাচ্ছে। কিন্তু রেখে যাচ্ছে অসম্পূর্ণ আশ্বাস আর ভাঙা স্বপ্ন। রোহিঙ্গাদের কাছে ইউনূস সরকারের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে রইল—আশা দেখানো, কিন্তু সেই আশাকে বাস্তবের মাটিতে নামাতে না পারা।
নতুন সরকারের সামনে রোহিঙ্গা সংকট আগের মতোই এক কঠিন বাস্তবতা। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এবার আর আবেগী বক্তব্য নয়—প্রয়োজন বাস্তবসম্মত নীতি, শক্ত কূটনৈতিক চাপ এবং রাষ্ট্রীয় দায় স্বীকারের স্পষ্টতা। না হলে ‘আগামী ঈদ’ শুধু তারিখ বদলাবে, ভাগ্য নয়।
বায়ান্ননিউজ২৪/এডিটর ইন চীফ
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন