বাংলাদেশ

জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে এসেও নতুন বই পায়নি ৩০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী !

প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারী ২০২৬ ২৩:৪৪

এক সময় পহেলা জানুয়ারি মানেই ছিল শিক্ষার্থীদের মুখে আনন্দের হাসি আর হাতে নতুন বই। বিগত এক দশকের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এই দিনটি জাতীয়ভাবে রূপ নিয়েছিল বই উৎসবে। বছরের প্রথম দিনেই প্রাক প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যের পাঠ্যবই পৌঁছে দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। আন্তর্জাতিক মহলেও এই উদ্যোগ প্রশংসিত হয়েছিল শিক্ষা বিস্তারে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের উদাহরণ হিসেবে।

কিন্তু চলতি শিক্ষাবর্ষে সেই ধারাবাহিকতায় বড় ধরনের ব্যত্যয় ঘটেছে। শিক্ষাবর্ষ শুরুর প্রায় এক মাস পার হয়ে গেলেও এখনও ৩০ লাখের বেশি পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছায়নি। পহেলা জানুয়ারির বই উৎসবের পর ১৫ জানুয়ারির মধ্যে শতভাগ বই বিতরণের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, ২৫ জানুয়ারি পেরিয়েও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে বিশেষ করে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা বই ছাড়াই পাঠ কার্যক্রম চালাতে বাধ্য হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রাক প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে বই বিতরণ সম্পন্ন হলেও সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে মাধ্যমিক পর্যায়ে। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে বই ঘাটতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। অনেক বিদ্যালয়ে আংশিক বই পৌঁছালেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ের বই এখনও হাতে পায়নি শিক্ষার্থীরা।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলিয়ে ১০৫টি প্রেসের মাধ্যমে প্রায় ৩০ কোটি ২৩ লাখ কপি পাঠ্যবই ছাপার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রায় শতভাগ বই মুদ্রণ সম্পন্ন হলেও বিতরণ পর্যায়ে এসে বড় ধরনের ধীরগতি দেখা দিয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে এখনও পৌঁছায়নি প্রায় ৩০ লাখ ৫৮ হাজার কপি বই, যা মোট বইয়ের দেড় শতাংশেরও কম হলেও সংখ্যার বিচারে তা লাখো শিক্ষার্থীর জন্য বড় ভোগান্তি।

পরিসংখ্যান বলছে, ষষ্ঠ শ্রেণিতে এক লাখের বেশি, সপ্তম শ্রেণিতে ১০ লাখের বেশি, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতেও কয়েক লাখ বই এখনও বিতরণ হয়নি। বিশেষ করে সপ্তম শ্রেণির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। এই শ্রেণিতেই অবিতরণকৃত বইয়ের বড় অংশ আটকে আছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি বছর বই ছাপার কাজ রিটেন্ডারের মধ্যে পড়ায় পুরো প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে। দরপত্র বাতিল ও পুনরায় আহ্বানের কারণে প্রেস নির্বাচন, কাগজ সংগ্রহ, মুদ্রণ সূচি নির্ধারণ এবং পরিবহন ব্যবস্থাপনায় বিলম্ব হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বই বিতরণ কার্যক্রমে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু প্রেসকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ এবং অনিয়মের কথাও আলোচনায় এসেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করেছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, বছরের শুরুতেই বই না পাওয়া শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় যে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে নতুন শিক্ষাক্রমের পাঠ্যবই সময়মতো না পাওয়ায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সমন্বয়হীনতার মুখে পড়ছেন।

এনসিটিবির কর্মকর্তারা দাবি করছেন, জানুয়ারির শেষ নাগাদ শতভাগ বই বিতরণ সম্পন্ন হবে। তবে অভিভাবক ও শিক্ষকরা প্রশ্ন তুলছেন, শিক্ষাবর্ষ শুরুর এক মাস পর বই হাতে পাওয়া কতটা কার্যকর হবে। তারা বলছেন, অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যে শৃঙ্খলা ও সময়ানুবর্তিতা ছিল, তা থেকে সরে আসার ফলেই আজ এই সংকট।

একসময় পহেলা জানুয়ারির বই উৎসব ছিল রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও শিক্ষা অগ্রাধিকারের প্রতীক। এবছর সেই উৎসবের আনন্দ অনেক শিক্ষার্থীর কাছে অধরাই থেকে গেছে। শিক্ষা খাতে এই ধরনের ব্যর্থতা শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতার চিত্রই তুলে ধরছে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষাজীবন নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে।

বায়ান্ননিউজ২৪/আইরিন

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন