যুক্তরাজ্যের স্থানীয় নির্বাচন
টাওয়ার হ্যামলেটসের বিভিন্ন ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদেও লড়ছেন অসংখ্য পরিচিত বাংলাদেশি মুখ। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অজন্তা দেব রায়, সৈয়দা সায়মা আহমেদ, সৈয়দ আবুল বাশার, রহিমা রহমান, রাবিনা খান, আবদুল কাদির চৌধুরী মুরাদ, সাঈদা চৌধুরী, আবু তালহা চৌধুরী, আমিনুর খান, স্মৃতি আজাদ, হামিম চৌধুরী এবং মঈন কাদরী।
প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ ০৩:০৮
যুক্তরাজ্যের বাঙালিদের মিলনকেন্দ্র টাওয়ার হ্যামলেটস
যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে এবার পূর্ব লন্ডনে যেন নতুন এক রাজনৈতিক ইতিহাসের আবহ তৈরি হয়েছে। টাওয়ার হ্যামলেটস, নিউহাম, রেডব্রিজ ও বার্কিং অ্যান্ড ড্যাগেনহাম—এই চার প্রশাসনিক এলাকায় মেয়র ও কাউন্সিলর পদে তিন শতাধিক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

বৃহস্পতিবার (৭ মে) অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচন শুধু স্থানীয় সরকার গঠনের লড়াই নয়, বরং ব্রিটেনে বাংলাদেশি কমিউনিটির দীর্ঘ সংগ্রাম, প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক উত্থানের বড় এক প্রতীক হয়ে উঠেছে।
পূর্ব লন্ডনের রাস্তাঘাট, কমিউনিটি সেন্টার, মসজিদ, দোকানপাট আর জনসভাগুলোতে এখন একটাই আলোচনা—কতজন বাংলাদেশি জয় পাবেন, কারা নতুন নেতৃত্ব হিসেবে উঠে আসবেন এবং বাঙালিদের রাজনৈতিক শক্তি এবার কতটা দৃশ্যমান হবে।
সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা বিরাজ করছে টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকায়। দীর্ঘদিন ধরেই এটি যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানকার বর্তমান মেয়র লুত্ফুর রহমান আবারও নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সিরাজুল ইসলাম, জামি আলী এবং মোহাম্মদ আবদুল হান্নান। অর্থাৎ মেয়র পদেই চার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীর লড়াই এবার পুরো নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।
টাওয়ার হ্যামলেটসের বিভিন্ন ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদেও লড়ছেন অসংখ্য পরিচিত বাংলাদেশি মুখ। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অজন্তা দেব রায়, সৈয়দা সায়মা আহমেদ, সৈয়দ আবুল বাশার, রহিমা রহমান, রাবিনা খান, আবদুল কাদির চৌধুরী মুরাদ, সাঈদা চৌধুরী, আবু তালহা চৌধুরী, আমিনুর খান, স্মৃতি আজাদ, হামিম চৌধুরী এবং মঈন কাদরী।
বাংলাদেশি অধ্যুষিত নিউহাম এলাকাতেও এবার বাঙালিদের শক্ত অবস্থান চোখে পড়ছে। এখানকার মেয়র পদে লড়ছেন ফরহাদ হোসেন এবং আরিক চৌধুরী। নিউহামের বিভিন্ন ওয়ার্ডে বাংলাদেশি তরুণ প্রার্থীদের প্রচারণাও বেশ আলোচনায় রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, নতুন প্রজন্ম এখন আর শুধু ভোটার নয়, বরং নেতৃত্বের আসনেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে।
রেডব্রিজ এলাকাতেও বাংলাদেশি প্রার্থীদের অংশগ্রহণ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। এখানকার ইলফোর্ড অঞ্চলে বাংলাদেশি ভোট এখন বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা। একইভাবে বার্কিং এন্ড ড্যাগেনহাম এলাকাতেও বাংলাদেশি প্রার্থীরা বিভিন্ন দলে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন।
স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিটেনে বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক যাত্রা সহজ ছিল না। ষাট ও সত্তরের দশকে শ্রমজীবী অভিবাসী হিসেবে যারা পূর্ব লন্ডনে বসতি গড়েছিলেন, তাদের পরবর্তী প্রজন্ম এখন প্রশাসন, শিক্ষা, আইন, চিকিৎসা ও রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পৌঁছে গেছে। একসময় বর্ণবাদী হামলা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামা সেই কমিউনিটি আজ ভোটের রাজনীতিতে নির্ধারক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে টাওয়ার হ্যামলেটসে বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক উত্থান এখন যুক্তরাজ্যের মূলধারার রাজনীতিতেও আলোচনার বিষয়। এখানকার দুই সংসদ সদস্য রুশনারা আলী ও আফসানা বেগম-ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। ফলে স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় রাজনীতি পর্যন্ত বাঙালিদের প্রভাব এখন স্পষ্ট।
কমিউনিটির প্রবীণদের অনেকেই বলছেন, এবারের নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং বাঙালিদের বহু বছরের সংগ্রামের ফসল। নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ তাঁদের মধ্যে নতুন আশার জন্ম দিয়েছে।
তবে একইসঙ্গে উদ্বেগও রয়েছে। বিশেষ করে একই এলাকায় একাধিক বাংলাদেশি প্রার্থী থাকায় ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেকের মতে, এতে অন্য সম্প্রদায়ের প্রার্থীরা সুযোগ পেতে পারেন।
তারপরও স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির বড় অংশের বিশ্বাস, এবারের নির্বাচনেও পূর্ব লন্ডনের নেতৃত্ব বাঙালিদের হাতেই থাকবে। কারণ জনসংখ্যা, ভোটার উপস্থিতি, সামাজিক সংগঠন এবং রাজনৈতিক সচেতনতা—সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশিরা এখন অত্যন্ত শক্ত অবস্থানে রয়েছেন।
নির্বাচন ঘিরে পূর্ব লন্ডনের বিভিন্ন এলাকায় এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। মসজিদ, রেস্টুরেন্ট, কমিউনিটি সেন্টার ও রাস্তাঘাটজুড়ে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রচারণা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সরব প্রার্থীরা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের সাফল্য শুধু স্থানীয় প্রশাসনে প্রতিনিধিত্ব বাড়াবে না, বরং ভবিষ্যতে ব্রিটিশ জাতীয় রাজনীতিতেও নতুন নেতৃত্ব তৈরির পথ খুলে দিতে পারে।
এখন পুরো কমিউনিটির চোখ আগামীকালের ভোটের দিকে। কারণ এই নির্বাচন শুধু কাউন্সিল গঠনের ভোট নয়, বরং ব্রিটেনে বাঙালিদের রাজনৈতিক শক্তি, ঐক্য ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের বড় এক পরীক্ষা।
প্রবাস থেকে আরো পড়ুন