রাজনীতি

চমক, কৌশল ও প্রত্যাশার মিশেলে তারেক রহমানের মন্ত্রিসভা

প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ০৪:০৭

মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন এর কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রীর শপথ পাঠ করছেন তারেক রহমান

দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, নির্বাচনী উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক নজরদারির পর অবশেষে দায়িত্ব নিল নতুন সরকার। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা শপথ নেওয়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে নতুন অধ্যায়। ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী নিয়ে গঠিত এই মন্ত্রিসভা আকারে বড়, গঠনে বহুমাত্রিক এবং রাজনৈতিক বার্তায় স্পষ্টতই কৌশলী।

প্রথম নজরে যা চোখে পড়ে তা হলো—প্রবীণ ও তরুণ নেতৃত্বের সমন্বয়। দলীয় আন্দোলনে পরীক্ষিত নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে বসানো হয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অভিজ্ঞ রাজনীতিক আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে, যা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের বার্তা বহন করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদের অন্তর্ভুক্তি প্রতীকী দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ; দীর্ঘদিন রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার একজন নেতাকে আইনশৃঙ্খলা খাতের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে দলীয় কর্মীদের মধ্যে আবেগী প্রতিক্রিয়া যেমন রয়েছে, তেমনি প্রশাসনিক মহলে রয়েছে বাস্তব প্রত্যাশা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আ.ন.ম. এহছানুল হক মিলনের প্রত্যাবর্তনকে অনেকেই অতীত অভিজ্ঞতার পুনরুজ্জীবন হিসেবে দেখছেন। নকলমুক্ত পরীক্ষার মতো উদ্যোগের স্মৃতি সামনে এনে শিক্ষা খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণে নুরুল হক নুরকে যুক্ত করা তরুণ নেতৃত্বের প্রতিফলন। প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির বাস্তবতায় এ খাতের কার্যকর ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

পররাষ্ট্রে রহস্য ও কূটনৈতিক সমীকরণ

সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত এসেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘিরে। দলীয় জ্যেষ্ঠ নেতাদের বাইরে রেখে টেকনোক্র্যাট কোটায় ড. খলিলুর রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক যোগাযোগে সক্রিয় থাকা এই কর্মকর্তার নিয়োগ রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা জন্ম দিয়েছে।

দলের একটি অংশ যেখানে দলীয় অভিজ্ঞ নেতাকে প্রত্যাশা করছিল, সেখানে প্রশাসনিক পটভূমির একজনকে বেছে নেওয়া হয়েছে। অনেকেই এটিকে কৌশলগত ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রয়াস হিসেবে দেখছেন, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে। তবে রাজনৈতিক মহলে ফিসফাসও কম নয়। কেউ কেউ মনে করছেন, এটি শুধু কূটনৈতিক প্রয়োজন নয়, বরং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সমীকরণের ফল।

খলিলুর রহমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যেসব সংবেদনশীল বিষয়ে যুক্ত ছিলেন, সেগুলো নতুন সরকারের নীতির সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্য পাবে—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। দলীয় মহলের একাংশ মনে করে, এ সিদ্ধান্তে দলীয় রাজনীতির বাইরে একটি প্রভাবশালী পরামর্শ বলয় কাজ করেছে। ফলে তার নিয়োগকে ঘিরে রাজনৈতিক রহস্য এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শামা ওবায়েদ ইসলামের অন্তর্ভুক্তি দলীয় ভারসাম্য রক্ষার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি দীর্ঘদিন দলীয় কূটনৈতিক যোগাযোগে যুক্ত ছিলেন। ফলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব—দুইয়ের সমন্বয় করার চেষ্টা স্পষ্ট।

নারী প্রতিনিধিত্ব ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার

৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভায় নারী রয়েছেন তিনজন—আফরোজা খানম পূর্ণমন্ত্রী এবং শামা ওবায়েদ ইসলাম ও ফারজানা শারমিন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে। তিনজনই রাজনৈতিক পরিবার থেকে উঠে আসা। তাঁদের অন্তর্ভুক্তি নারীর অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখলেও সংখ্যাগত দিক থেকে এটি সীমিত প্রতিনিধিত্ব।

তবে তাঁদের পটভূমি আলাদা। একজন ব্যবসায়ী-রাজনীতিক, একজন সাংগঠনিক নেত্রী এবং একজন আইনজীবী। এ বৈচিত্র্য মন্ত্রিসভায় নীতিগত আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

বড় মন্ত্রিসভা, বড় দায়

এই মন্ত্রিসভা শুধু রাজনৈতিক ভারসাম্য নয়, প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জও বয়ে এনেছে। বড় আকারের মন্ত্রিসভা মানে সমন্বয়ের জটিলতা। সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি, নীতি বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং মন্ত্রণালয়গুলোর পারস্পরিক সমন্বয়—সবই এখন পরীক্ষার মুখে।

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি রোধ, আইনশৃঙ্খলা স্থিতিশীল করা, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা—এই পাঁচটি ক্ষেত্রেই দ্রুত অগ্রগতি দেখাতে হবে। জনগণের প্রত্যাশা এখন অনেক উঁচুতে।

শেষ কথা

নতুন মন্ত্রিসভা রাজনৈতিকভাবে কৌশলী, বার্তায় ভারসাম্যপূর্ণ এবং গঠনে বহুমাত্রিক। তবে ইতিহাস বলে, মন্ত্রিসভার গঠন নয়—তার কার্যকারিতাই চূড়ান্ত মূল্যায়নের মানদণ্ড।

খলিলুর রহমানের রহস্যময় অন্তর্ভুক্তি থেকে শুরু করে তরুণ ও প্রবীণের সমন্বয়—সব মিলিয়ে এটি একটি জটিল রাজনৈতিক সমীকরণের ফল। এখন প্রশ্ন একটাই: এই সমীকরণ কি স্থিতিশীল শাসন ও দৃশ্যমান ফলাফলে রূপ নেবে, নাকি অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনই সামনে আসবে?

দেশ এখন অপেক্ষায়—প্রতিশ্রুতির নয়, ফলাফলের।

রাজনীতি থেকে আরো পড়ুন