অর্থনীতি

ডলার বাজারে কৃত্রিম নিয়ন্ত্রণ, ৪ বিলিয়নের বেশি ডলার কিনল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ২১:০২

বাংলাদেশ ব্যাংক

ডলার বাজারে স্বাভাবিক নিয়মে দর নির্ধারণের সুযোগ না দিয়ে কৃত্রিম হস্তক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে সরকার। চলতি অর্থবছরে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে একদিকে বাজারে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের ভুল নীতির দায় চাপানো হচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতির ওপর।

সোমবার ১৬টি ব্যাংক থেকে মাল্টিপল প্রাইস অকশন পদ্ধতিতে ২১ কোটি ৮৫ লাখ মার্কিন ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ সময় ডলারের এক্সচেঞ্জ রেট ও কাট অফ রেট নির্ধারণ করা হয় ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। সব মিলিয়ে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো থেকে ৪১৫ কোটি ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাবি, প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয় বাড়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। ফলে দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই অজুহাতে ডলারের দর ধরে রাখতে বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার তুলে নেওয়া হচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন, এটি মূলত দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতা ঢাকার আরেকটি প্রচেষ্টা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২২ সাল থেকেই দেশের ডলার বাজার ভয়াবহ অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। তখন প্রতি ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে লাফিয়ে ১২২ টাকায় পৌঁছে যায়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা সিদ্ধান্ত নিলেও বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ব্যাপক হারে ডলার বিক্রি করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে। অথচ একই সময়ে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কেনা হয়েছে মাত্র এক বিলিয়ন ডলারের মতো। এতে রিজার্ভ দ্রুত কমে যায় এবং দেশের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়।

সরকার পরিবর্তনের পর অর্থপাচার বন্ধে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হলেও, বাস্তবে ডলার বাজার এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক ধারায় ফিরেনি। সরবরাহ বাড়লেও চাহিদা না থাকায় স্বাভাবিকভাবে ডলারের দাম কমার কথা। কিন্তু সেটি হতে না দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেরাই ক্রেতা হয়ে বাজারে নেমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, ডলারের দর কমে গেলে প্রবাসী আয় ও রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই বাজারে ভারসাম্য রাখতে ডলার কেনা হচ্ছে। তবে সমালোচকদের মতে, এটি বাজার ব্যবস্থায় অযাচিত হস্তক্ষেপ, যা দীর্ঘমেয়াদে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রবাসীরা দেশে ৩১৭ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৫ শতাংশের বেশি। এ প্রবাহের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বেড়ে ২৯ জানুয়ারি শেষে মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার। তবে বিপিএম ৬ পদ্ধতিতে হিসাব করলে কার্যকর রিজার্ভ রয়েছে ২৮ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার।

উল্লেখ্য, ২০২১ সালের আগস্টে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিল। সেখান থেকে ধারাবাহিক অব্যবস্থাপনা ও ভুল নীতির কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় রিজার্ভ নেমে আসে মাত্র ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরেছে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

বায়ান্ননিউজ২৪/আইরিন

অর্থনীতি থেকে আরো পড়ুন