বিজ্ঞান

২০৩০ সালে মঙ্গলে পা ফেলবে নাসা?

প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারী ২০২৩ ১১:৩৮

 মানুষ প্রথমে চাঁদে যায় ১৯৬৯ সালে, যা সারা পৃথিবীকে শিহরিত করেছিল। অ্যাপলো-১১ মিশন থেকে চাঁদের পৃষ্ঠে পা ফেলে নিল আর্মস্ট্রং বলেছিলেন, ‘মানুষের জন্য এটি ছোট একটি পদক্ষেপ, কিন্তু মানবজাতির জন্য এক বিরাট ঘটনা।’ এরপর প্রায় পাঁচ বছর ধরে পৃথিবীর এই উপগ্রহটিতে অবতরণ করেছে মানুষবাহী ছ’টি মিশন, চাঁদের পিঠে হেঁটেছেন মোট ১২ জন নভোচারী। ওই সময় তাঁরা ছবি তুলেছেন, পতাকা গেড়েছেন, পরীক্ষা চালিয়েছেন এবং চাঁদের বিভিন্ন স্থান থেকে তাঁরা ৩৮০ কেজির মতো নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে নিয়ে এসেছেন।   সবশেষ মিশনটি পাঠানো হয় ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে। তখন ভাবা হয়েছিল, ভবিষ্যতে মানুষ ঘন ঘন চাঁদে যাবে এবং উপগ্রহটি মহাকাশ গবেষণায় নিয়মিত এক গন্তব্যে পরিণত হবে। কিন্তু সে রকম হয়নি। ১৯৭২ সালের ওই মনুষ্য-মিশনই ছিল শেষ অভিযান এবং চাঁদে পৃথিবীর শেষ অতিথি ছিলেন নভোচারী ইউজিন সারনান। এরপর অর্ধ-শতাব্দীকাল ধরে আর কেউ চাঁদে অবতরণ করেননি।   এক হিসেবে বলা হয়, পৃথিবীতে বর্তমানে যত মানুষ আছেন, তাদের অর্ধেকেরও বেশি চাঁদের পিচে কাউকে হাঁটতে দেখেননি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা চাঁদে আবার মানুষ পাঠাতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এজন্য তাদের প্রস্তুতি চলছে প্রায় এক দশক ধরে। তাদের আর্টেমিস মিশনে এখনও পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৪,০০০ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ। তৈরি করেছে এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী রকেট এসএলএক্স। নাসার লক্ষ্য,২০২৫ সালের মধ্যে এই রকেটে করে চাঁদে আবার মানুষ পাঠানো। ওই দৌড়ে নাসা এখন আর একা নয়। প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়েছে আরও কয়েকটি দেশ।   এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, ৫০ বছর পর নাসা কেন চাঁদে মানুষ পাঠাতে আগ্রহী হয়ে উঠল? পৃথিবীর এই উপগ্রহটিকে কেন্দ্র করে কি নতুন করে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে? বিজ্ঞানীদের কেউ কেউ বলছেন, চাঁদকে ঘিরে চীনের স্বপ্নও আর্টেমিস মিশনের পিছনে একটা কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে। কারণ, চীনও ২০৩০ সালের মধ্যে সেখানে একটি ঘাঁটি গড়ে তুলতে চায়। নাসার মহাকাশবিজ্ঞানী ড.অমিতাভ ঘোষ বলছেন, ৫০ বছর ধরে চাঁদে নাসায় মানুষ না পাঠানোর পেছনে বৈজ্ঞানিক কোনো কারণ নেই। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনাতেই তা করা হয়নি। ২০ বছর ধরে আমেরিকায় একটা বিতর্ক হয়েছে-‘আমরা আবার চাঁদে যাব নাকি? চাঁদে তো আমরা গিয়েছি, এবার মঙ্গলে যাব? কিন্তু দেখা গেল, মঙ্গলে যাওয়ার এই পরিকল্পনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। নাসার যে বাজেট তার চেয়েও ২০ গুণ বেশি অর্থের প্রয়োজন মঙ্গলে যেতে, যা বাস্তবসম্মত নয়,’ বলেন তিনি। চীনা বা অন্য কোনো দেশ মিশনের কারণে নাসা চাঁদের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেছে এ কথা মানতে রাজি নন ঘোষ। তিনি বলেন,দেখুন চাঁদে রোভার আর মানুষ পাঠানো এক নয়। রোবট পাঠানো সহজ। কিন্তু মানুষ পাঠানো অনেক কঠিন। এ জন্য অনেক শক্তিশালী রকেটের প্রয়োজন। অনেক অর্থের দরকার। চিনের এ রকম কোনও রকেট নেই এবং চাঁদে মানুষ পাঠানোর কথা তারা এখনও বলেনি বা চিন্তাও করেনি।   আসলে চাঁদে মানুষ অবতরণের প্রতিযোগিতা শুরু করেছিল ১৯৬২ সালে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি তাঁর এক ভাষণে এ রকম এক স্বপ্নের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমরা চাঁদে যাব বলে ঠিক করেছি।’ তিনি বলেন, এটা সহজ বলে নয়, বরং এই কাজটা কঠিন বলেই তাঁরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট কেনেডি ষাটের দশকের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানোর কথা বলেছিলেন এবং তাঁর সেই স্বপ্ন সাত বছরের মধ্যেই বাস্তবে পরিণত হয়। কিন্তু এর কয়েক বছরের মধ্যেই নাসার চন্দ্রাভিযান বন্ধ হয়ে যায়। সংস্থাটির বাজেটে এত ব্যাপক কাটছাঁট করা হয় যে, অ্যাপলো মিশনের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। শুরুতে মোট ২০টি অ্যাপলো মিশনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু চাঁদে অবতরণের পর প্রযুক্তি ও গবেষণা নির্ভর এই মিশন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকদের কাছে, ক্রমশই গুরুত্ব হারাতে থাকে। ফলে শেষ তিনটি মিশন বাতিল করা হয় এবং চাঁদে নাসার মিশন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।   অ্যাপলো-১১ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি রাজনৈতিক মিশন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, চাঁদে মানুষ পাঠিয়ে মহাকাশেও যে তারা শক্তিশালী সারা পৃথিবীর কাছে এ রকম একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ছিল চাঁদে যাওয়ার দৌড়ে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরাজিত করা। তাতে তারা সফলও হয়েছিল। নাসার বিজ্ঞানী ড.ঘোষ জানান, নাসার প্রথম চাঁদে যাওয়াটা ছিল সামরিক কারণের একটি অংশ। শীতল যুদ্ধের কারণে সে সময় রাশিয়ার সঙ্গে একটা প্রতিযোগিতা ছিল। সামরিক কারণটা চলে যাওয়ার পর এত অর্থ খরচ করে চাঁদে মানুষ পাঠানো আর যৌক্তিক বলে বিবেচিত হলো না।’ ‘তাই আমেরিকা মহাকাশ গবেষণার বাজেট অনেক কমিয়ে দিল। তারা ভাবল আমরা অন্য কোনও সক্ষমতা অর্জন করি,’ জানান তিনি।   চাঁদে যাওয়ার জন জেএফ কেনিডি সরকার প্রাথমিকভাবে বাজেট নির্ধারণ করেছিল ৭০০ কেটি ডলার। কিন্তু পরে সেটা ২০০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এত বিশাল অর্খ খরচ করে চাঁদে মানুষ পাঠানোর ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণেরও খুব একটা সমর্থন ছিল না। কারণ, সে সময় দেশটিতে নানা ধরনের সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল। নাসার বিজ্ঞানীরা বলছেন, তাদের বর্তমান চন্দ্রাভিযানের পেছনে মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মহাকাশের আরও দূরে যাওয়ার স্বপ্ন। বলা হচ্ছে, আর্টেমিস মিশনে তারা চাঁদ দেখতে যাচ্ছেন না, এবার তারা সেখানে থাকতে যাচ্ছেন। নাসার উদ্দেশ্য, চাঁদের বুকে একটি ঘাঁটি গড়ে তোলা যেখান থেকে মঙ্গল গ্রহে অভিযান চালানো হবে।   মহাকাশ বিজ্ঞানী অমিতাভ ঘোষ বলেন, ‘চিন্তাধারাটা হচ্ছে, মঙ্গলে যাওয়ার জন্য যে টেকনোলজি তৈরি করতে হবে সেটা চাঁদেই ডেভেলপ করা ভাল। কারণ, মঙ্গল চাঁদের চেয়েও বহুগুণ দূরে।’ যেখানে তিনদিনে পৌঁছানো যাবে সেখানে গিয়ে আমরা জিনিষটা শিখে নেব এবং পরে সাত মাসের যাত্রা করে মঙ্গলে পৌঁছাবো।’   অমিতাভ ঘোষ বিশ্বাস করেন, মানুষের পক্ষে চাঁদে থাকা সম্ভব। এজন্য সেখানে শুধু থাকার মতো একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে।‘আমরা যে আন্টার্কটিকায় থাকি, কী সাহারা মরুভূমিতে থাকি, আমরা থাকি একটা হ্যাবিটেশন মডিউলে। এখানে বিদ্যুৎ আছে, খাবারও আছে। চাঁদেও এমন মডিউল তৈরি করা যাবে। সেখানে শুধু অক্সিজেন আর পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে,বলেন তিনি।   নাসার একজন প্রশাসক বিল নেলসন জানিয়েছেন, বর্তমান আর্টেমিস মিশনে নভোচারীরা মহাকাশে এমন এক প্রযুক্তি তৈরি করবেন, যাতে মঙ্গল গ্রহে প্রথমবারের মতো মানুষ পাঠানো সম্ভব হয়।’ প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২০১০ সালে এই স্বপ্নের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, নাসাকে মহাকাশের আরও চ্যলেঞ্জিং গন্তব্য ঠিক করতে হবে। যেতে হবে চাঁদের চেয়েও দূরের কোনো গ্রহাণু এবং মঙ্গল, জুপিটার কিংবা শনির মতো কোনও গ্রহে। বর্তমান আর্টেমিস মিশনের নাম ঠিক করা হয় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে।   সেই আর্টেমিসকে এখন পাঠানো হচ্ছে চাঁদের অভিমুখে। আপাতত এতে কোনো নভোচারী থাকবে না। এর ওরাইঅন মডিউল ৪২ দিন ধরে চাঁদকে প্রদক্ষিণ করবে। এ সময় চাঁদে মানুষ পাঠানোর বিষয়ে বেশ কিছু পরীক্ষাও চালানো হবে।

ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৫ সালের কোনো একসময় পৃথিবীর মানুষ আবারও চাঁদে পা ফেলবে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সেটাই হবে চাঁদের চেয়েও দু’শ’ গুণ বেশি দূরে অবস্থিত মঙ্গলের অভিমুখে মানবজাতির প্রথম পদক্ষেপ। নাসার স্বপ্ন ২০৩০ সালের মধ্যে মঙ্গলে পা ফেলা যদি সব ঠিকঠাক থাকে।

বিজ্ঞান থেকে আরো পড়ুন