গ্রাফিক্স : বায়ান্ননিউজ২৪
ব্রিটেন এখন এক গভীর রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটির ঐতিহ্যবাহী দুই প্রধান দল লেবার ও কনজারভেটিভ উভয়ই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, নেতৃত্ব সংকট এবং জনসমর্থন হারানোর চাপে পড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে জাতীয় অর্থনীতি, জনসেবা এবং সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক আস্থায়।
ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভেতরে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তীব্র কোন্দল প্রকাশ্যে এসেছে। গোর্টন ও ডেন্টন উপনির্বাচনকে ঘিরে দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটি গ্রেটার ম্যানচেস্টারের জনপ্রিয় মেয়র অ্যান্ডি বার্নহামকে প্রার্থী হতে বাধা দিলে তা দলের ভেতরে বড় ধরনের ক্ষোভ সৃষ্টি করে। উত্তর ইংল্যান্ডের একাধিক এমপি ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতা এই সিদ্ধান্তকে দলীয় গণতন্ত্রবিরোধী বলে আখ্যা দিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লেবারের এই অভ্যন্তরীণ সংকট সরাসরি ভোটব্যাংকে প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, বার্নহামকে সরিয়ে দেওয়ার ফলে ভোটারদের একটি বড় অংশ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, যার সুবিধা নিচ্ছে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকে। অনেক ভোটারের ধারণা, লেবার নেতৃত্ব এখন লন্ডনকেন্দ্রিক ও আমলাতান্ত্রিক হয়ে উঠেছে এবং নিজ দলের জনপ্রিয় নেতাদের প্রতিও সহনশীল নয়।
অন্যদিকে কনজারভেটিভ পার্টি ইতিহাসের অন্যতম দুর্বল সময় পার করছে। একের পর এক নেতৃত্ব পরিবর্তন, নীতিগত দিকনির্দেশনার অভাব এবং অর্থনীতি ও জনসেবা খাতে ব্যর্থতার অভিযোগে দলটির জনসমর্থন দ্রুত কমছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারির বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, কনজারভেটিভদের সমর্থন নেমে এসেছে ১৯ শতাংশে, বহু এলাকায় তারা তৃতীয় বা চতুর্থ স্থানে অবস্থান করছে। এমনকি প্রবীণ ভোটারদের মধ্যেও দলটির ঐতিহ্যগত সমর্থন ভাঙতে শুরু করেছে।
এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে দ্রুত উত্থান ঘটাচ্ছে রিফর্ম ইউকে। একসময় প্রতিবাদী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিচিত দলটি এখন কার্যকর পার্লামেন্টারি শক্তিতে রূপ নিচ্ছে। দলটিতে যোগ দিয়েছেন কনজারভেটিভদের একাধিক সাবেক মন্ত্রী ও এমপি। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শ্রমজীবী ভোটারদের মধ্যে রিফর্ম ইউকে’র সমর্থন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা মূলত কনজারভেটিভদের পুরনো ভোটব্যাংককে ভেঙে দিচ্ছে।
ব্রিটেনের এই রাজনৈতিক অস্থিরতা কেবল দলীয় সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের দুই দলভিত্তিক রাজনীতির ভাঙনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্থানীয় নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি নেমে আসায় স্পষ্ট হচ্ছে যে, সাধারণ মানুষ ওয়েস্টমিনস্টার রাজনীতির প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে বামপন্থি বিকল্প রাজনীতির সম্ভাবনা তৈরি হলেও জেরেমি করবিন ও তার সহযোগীদের উদ্যোগ প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সাংগঠনিক দুর্বলতায় সেই আন্দোলনও গতি হারিয়েছে। এতে ব্রিটিশ মুসলিম, দক্ষিণ এশীয়, বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ভোটারদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে, যারা একসময় লেবার ও করবিনপন্থি রাজনীতিকে নিজেদের কণ্ঠস্বর মনে করতেন।
ডানপন্থার বিপরীতে গ্রিন পার্টি ধীরে ধীরে তরুণ ও নগরকেন্দ্রিক ভোটারদের কাছে বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে। তবে পরিবেশবাদী রাজনীতি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট মোকাবিলায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে ব্রিটেনের রাজনীতি এখন এক অনিশ্চিত মোড়কে দাঁড়িয়ে। কনজারভেটিভদের দুর্বলতা এবং লেবারের ভাঙনের মধ্যে ২০২৬ সালের স্থানীয় নির্বাচন বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী লড়াই আর কেবল বাম বনাম ডান নয়, বরং প্রতিষ্ঠিত রাজনীতি বনাম নতুন বিকল্প শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
বায়ান্ননিউজ২৪/এডিটর ইন চীফ
বিশ্ব থেকে আরো পড়ুন