শিল্পই শুশ্রুষা

প্রকাশিত: ১৬ জুন, ২০২২ ০৪:৪১ (সোমবার)
শিল্পই শুশ্রুষা

fdhj

শত শত ভয়ের গল্প সেখানে। সত্যগুলো গল্প হয়ে গেছে। রেখে গেছে জীবনের সুগভীর সুর। জন্মের উচ্ছ্বাস, আরোগ্যের সুখ। জ্বেলে গেছে আশার মোমবাতি। বহুদিন পর নিউইয়র্কের এলমহার্স্ট হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে ফিরে পেলাম সাড়ে তিন বছরের পুরোনো গল্পগুলো। অক্ষত আর আনকোরা গল্প। ভয়ের গল্পগুলো আর কাছে দাঁড়াতে পারল না। নীল পোশাকের দুজন সেবিকা চলে গেলেন। মনে হলো পরিচিতদের কেউ। তাদের পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করলাম। তাদের পথটিই আমার পথ মনে হলো। তারপর আবার পিছু ফিরে এলমহার্স্টের সদর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। স্ট্যান্ডের সঙ্গে রাখা মাস্কের প্যাকেট থেকে একটি মাস্ক পরে নিলাম। মনে পড়ে গেল এলমহার্স্ট হাসপাতালের সঙ্গে শিল্পের সুগভীর সখ্য খুঁজে পাওয়া দিনগুলো। মাঝে মাঝেই হাসপাতালের লবিতে জমে ওঠে শিল্পকর্ম প্রদর্শনী।

অন্য কোনো কারণে এই পথ দিয়ে যাচ্ছি। অন্য কোনো দপ্তর খুঁজছি। কিছুক্ষণেই সেসব গৌণ হয়ে গেল। এলমহার্স্টের কমিউনিটি ক্লিনিকের সদর দরজার বাইরের ঘেরার সঙ্গে প্যানাফ্লেক্স পর্দায় মুদ্রিত আলোকচিত্রের সারি। সেখানে লেখা 'আর্ট ইজ হিলিং'। পৃথিবীতে হাজার হাজার গবেষণা আছে শিল্প আর শুশ্রুষা নিয়ে। শিল্প যে জীবনের আশ্রয়, জীবনের আধার সে সত্য আমিও উপলব্ধি করি। গভীরভাবে বিশ্বাস করি, শিল্পই শুশ্রুষা। গুগল করে ছবি পাই, করোনাযুদ্ধের কঠিন সময়ে যখন এলমহার্স্টের প্রবেশমুখে অগণিত রোগীর ভিড়, আর বহির্গমনে অগণিত লাশ, যখন এখানে চব্বিশ ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, তখন এখানকার ডাক্তাররা তুলি হাতে ছবি এঁকেছেন। ক্যামেরা হাতে ছবি তুলেছেন। হাসপাতালের যেসব কর্মীর খোঁজ কেউ রাখে না, তারা হয়ে উঠেছিলেন বিখ্যাত আলোকচিত্রীদের মডেল। আর এসব আলোকচিত্রই হয়ে উঠেছিল সেসময়ের তহবিল সংগ্রহের এক শিল্পিত উদ্যোগ। এলমহার্স্ট হসপিটাল এই কাজগুলো করেই থাকে। এখনও হাসপাতালের বাইরে সেই প্রদর্শনীর নমুনা রয়ে গেছে। এখনও এসব শিল্পের বিপুল আবেদন। আমি তো থমকে গেলাম। কেউ কিছু বলেনি। রীতিমতো আটকে থাকলাম অনেকক্ষণ।

wdgfg

সাড়ে তিন বছর আগের কথা। আমি এলমহার্স্ট হসপিটালে নিয়মিত আসতাম। লবিতে বসে থাকতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা। রোগী ঢুকতো পিপিই পরে, স্ট্রেচারে। ডাক্তার, নার্সরা মুখে মাস্ক পরে চলতো। আমি দুই সন্তানকে দেখতে শিশুদের বিশেষ যত্নের বিভাগে যেতাম। আমাকে বারবার সাবান দিয়ে হাত ধুতে হতো, অ্যালকোহলের মিষ্টি গন্ধ মাথা স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হতো। মাঝে মাঝে কৌশলে হাত ধোয়া আর স্যানিটাইজার ব্যবহারের বিষয়টি এড়িয়ে যেতাম। কিন্তু নার্সরা ঠিকই আমাকে বাধ্য করতেন। মিষ্টিমধুর সম্পর্ক তাদের সাথে। আমি হিসেব করতাম, কি বিপুল পরিমাণ সাবান আর হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার হচ্ছে এখানে। এসব বেশি বেশি। তখনও পৃথিবীতে করোনা আসেনি। তখনও আন্তর্জাতিক দিবস করে মানুষকে হাত ধোয়া শেখানো হয়। মাস্ক পরা তো দূরের কথা। আমি এলমহার্স্টের লবিতে রাখা মাস্ক স্যান্ড থেকে এক গাট্টি করে মাস্ক নিতাম। জুতো মোছার জন্য। সেই এলমহার্স্টের চেহারা পাল্টে গিয়েছিল করোনা যুদ্ধের সময়। পিপিই থেকে শুরু করে সবকিছুর সংকট দেখা দেয়। তখন নিউইয়র্কের শিল্পীরা এক হয়ে এলমহার্স্টকে ঘিরে আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়। কী অসাধারণ ব্যাপার! 'শিল্পই জীবনের সুরক্ষা' সশব্দে কাজে লাগছে এখানে। আর সেই শিল্প সুষমায় মানুষ নতুন করে বুঝছে শিল্পই জীবন। শিল্পই মানবতা ও ধর্মের মূল সুর।

আলোকচিত্রীদের দলে ছিলেন নিউইয়র্কের ৯৬ জন। তারা ১৮৭টি আলোকচিত্র মুদ্রণ করেছিলেন। দশ দিনে তারা তহবিল তুলেছিলেন ভালোই। ১৩ লাখ ৮ হাজার ডলারের মতো। নিউইয়র্ক টাইমস এ তহবিল সংগ্রহকারীদের একজন জ্যাসন ফারাগো লিখেছিলেন, জীবনের পক্ষে সমস্ত ব্যবস্থাকে পাল্টে দেয়ার মতো সাধ্য শিল্পীদেরই আছে। মনে হলো শিল্প আর স্বাস্থ্য এভাবে পাশাপাশি হাঁটলে মানুষ অনেক বেশি সাহসী হতে পারে। এলমহার্স্ট হাসপাতালকেও মনে হলো সাহসের দূর্গ।

সম্পাদক ও প্রকাশক: গোলাম রসুল খান

মোবাইল: +44 7440589342

তথ্য ও প্রযুক্তি সহযোগী - আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.