২০২২-২৩ সালের বাজেট: কিঞ্চিৎ আলোচনা

প্রতি অর্থবছরে দেশের সরকার একটি বাজেট ঘোষণা করে থাকেন, যাতে ওই অর্থবছরে কত ব্যয় হবে এবং কত আয় হবে তার বিশদ বিবরণ উল্লেখ থাকে। সেই নিয়মে ৯ জুন২ মহান জাতীয় সংসদে মাননীয় অর্থমন্ত্রী ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বাজেট। প্রায় পৌনে সাত লাখ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছেন মাননীয় মন্ত্রী। এতে ঘাটতি ধরা হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা। এত বড় ঘাটতির বাজেটকে সরকারি তরফে বলা হচ্ছে গরিব ও ব্যবসাবান্ধব বাজেট। আর বিরোধীরা বলছে গরিব মারার বাজেট। সিপিডি বলছে অনৈতিক। বিশাল এবাজেটের আয়ের উৎস হিসেবে ধরা হয়েছে
১৷ রাজস্ব থেকে সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা।
২৷ অভ্যন্তরীণ ব্যাংক বা অন্যান্য খাত থেকে লাখ কোটি টাকা।
৩। রেমিটেন্স ও বৈদেশিক বাণিজ্য থেকে আয়।
৪৷ বৈদেশিক ঋণ/সাহায্য থেকে বাদ বাকি টাকা আসবে।
আলোচনার বিষয় হলো রাজস্ব আয় কী এত পরিমাণ আদায় করা সম্ভব? দেশে ১৮ কোটি মানুষ। তার মধ্যে মাত্র ৭২ লাখ মানুষের টিআইএন আছে। তন্মধ্যে গত অর্থবছরে মাত্র ৪০ লাখ টিআইএন হোল্ডার ট্যাক্স দিয়েছেন। দেশে ট্যাক্স প্রদানে সক্ষম এমন মানুষের সংখ্যা প্রায় দেড় লক্ষাধিক। সরকার করের হার না বাড়িয়ে কর প্রদানে সক্ষম মানুষকে করের আওতায় আনছেন না কেন? সরকারি তরফে বলা হচ্ছে, সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানো হয়েছে। আসলে কী তাই? পাঁচ বছর আগে যে পরিমাণ বৃদ্ধ ভাতা/বিধবা ভাতা ছিল, তা এখনও সে পরিমাণ রয়েছে। পাঁচ বছর আগের পাঁচশ টাকায় যা কেনা যেত, এখন কি পাঁচশ টাকায় সেই পরিমাণ দ্রব্য-সামগ্রী কেনা সম্ভব? পাচারকৃত টাকা দেশে ফিরিয়ে আনার বদলে সেগুলো হালাল করার জন্যে ওদেরকে যে সুযোগ দেয়া হয়েছে, তা কি নৈতিক? তাহলে পি কে হালদার, ডেসটিনির মতো আরও যারা ধরা পড়েছে বা দুদকের মামলায় জেলে আছে তাদের বেলায় কী করা হবে? —এরকম হাজারো প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
কোভিড ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্বে দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বমুখী, যা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের অবস্থা খুবই নাজুক। দিন দিন দ্রব্যমূল্য বাড়ছে। কিন্তু মানুষের আয় বাড়ছে না। ক্ষেত্রবিশেষে তা কমছে। মাত্র কিছুদিন আগে ভোজ্যতেলের দাম ৩৮ টাকা বাড়ানো হলো। অথচ বাজেট ঘোষণার দিন খোলা ও বোতলজাত তেলের দাম লিটারপ্রতি যথাক্রমে পাঁচ টাকা ও সাত টাকা বাড়িয়ে দেয়া হলো। যেখানে ২ জুন বাণিজ্যমন্ত্রী মহোদয় বলেছিলেন, ‘বিশ্ববাজারে ভোজ্য তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। আমরা সপ্তাহখানেকের মধ্যে বৈঠকে বসে আমাদের দেশেও দাম কমানোর ব্যবস্থা করব।’ ১০ জুন বাজেটোত্তোর সাংবাদিক সম্মেলনে কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘গ্রামের মানুষ ভালো আছে। কারণ গ্রামে মোটা চালের দাম কম। আর শহরের মানুষ অসুবিধায়। কারণ কতিপয় ব্যবসায়ী চাল চিকন ও প্যাকেটজাত করে বিক্রি করে।’ আসলে কি তাই? আমাদের কাছে নিত্যই গ্রামের ও শহরের নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষজন আসেন। তাঁদের দুঃখ-দুর্দশার কথা বলেন। মন্ত্রী মহোদয়দের কথার সাথে বাজারের অবস্থা ও মানুষের বলা কথার মিল পাওয়া যায় না। মুদ্রামান দিন দিন কমছে। ডলারের দাম বাড়ছে। রেমিট্যান্স কমছে। তৈরি পোশাকের দাম বিদেশের বাজারে কমতির দিকে। দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যত নিয়ে অর্থনীতিবিদরা শংকিত। খোদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ নিয়ে শংকা প্রকাশ করেছেন। তাই আমাদের সামলে চলা উচিত।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদেরাসহ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন—
১৷ বিলাস দ্রব্য আমদানি বর্জন করতে হবে।
২৷ মেঘা প্রকল্প আপাতত সীমিত করতে হবে।
৩৷ কর না বাড়িয়ে করযোগ্যদের করের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
৪৷ বিমান ও হেলিকপ্টারের যন্ত্রাংশ আমদানি বন্ধ করতে হবে।
৫৷ অন্তত আড়াই কোটি মানুষকে দল-মত নির্বিশেষে রেশন কার্ড প্রদান করতে হবে। তারা যাতে প্রতিমাসে রেশন পায় সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা খুবই প্রয়োজন।
৬৷ যেকোনোভাবে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে।
৭৷ বিদেশে অর্থপাচার রোধ করতে হবে।
গ্রাম্য প্রবাদ ‘ঋণ করে ঘি খাওয়া উচিৎ নয়।’ আমরা বাঙালি ঋণ করে ঘি খাই। এটি থেকে বিরত থাকা সময়ের দাবি। দেশ এখন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। সকল মহলের উচিৎ সামলে কথা বলা। ক্ষমতা আসবে। ক্ষমতা যাবে। আগে সকলে মিলে মানুষ বাঁচান। মানুষ বাঁচলে দেশ বাঁচবে। নতুবা সকলকে পস্তাতে হবে।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.