সমস্যার দুর্বৃত্তায়ন, সমাধানের হতাশা

দেশে এখন একটাই সমস্যা— মৌসুমী, জায়েদ খান আর ওমর সানী। খবরের মাধ্যম থেকে শুরু করে বুদ্ধিবৃত্তি সবখানে প্রধান চর্চা এনিয়েই। যেটা সফটকোর গসিপ, সেটা যখন চর্চার প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে, তখন দেশে চিন্তার দৌড়টা বোঝা সহজ হয়। এই চিন্তায় রাষ্ট্র সংস্কার তো দূর কা বাত, গোয়াল সংস্কারও সম্ভব না।
‘মৌসুমী কারে ভালোবাসো তুমি’ ফিডব্যাকের গানের কথা যখন অনেকেরই আলোচনার বিষয়বস্তু, তখন আমি পড়ছিলাম দেশের ভোলা জেলার একটি খবর। ভোলার উপজেলা দৌলতখান, তার একটি ইউনিয়ন হলো হাজীপুর। যেটি এখন কাজির গরু। কেতাবে আছে গোয়ালে নেই। নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে ইউনিয়নটি। যার কোনো অস্তিত্বই নেই। শুধু নদীতে সদ্য জেগে উঠা চর আছে এবং সেখানে রয়েছে গরু-মহিষের বাথান ও মাছের আড়ত। মানুষের বাস নেই। নদীভাঙা মানুষদের যা হয়, তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছেন জেলার বিভিন্ন জায়গায়। কাহিনীর এটুকু তো ঠিকই আছে, এমনটাই হয়। কিন্তু টুইস্টটা হলো নির্বাচন কমিশনের কাণ্ডে। তারা কেতাবের গরু মানে নদীর পেটে যাওয়া সেই ইউনিয়নের নির্বাচন করছে। আগামী ১৫ জুন সে নির্বাচন। এমন খবরই জানালো এনটিভি অনলাইন।
বহুদিন আগে বিটিভির নাটকের জনপ্রিয় খল চরিত্র কানকাটা রমজানের কথা মনে পড়ে গেলো। অভিনয় করেছিলেন প্রয়াত হুমায়ুন ফরিদী। তার একটা সংলাপ ছিলো তখন মুখে মুখে। ‘আমি জমি কিনি না, পানি কিনি, পানি’। এই ভোটকাণ্ড তেমনি পানির কারবার। মজার ব্যাপার হলো, এই নির্বাচনে নয়টি ওয়ার্ডের ভোটকেন্দ্র হচ্ছে দৌলতখান পৌরসভার একটি প্রাথমিক স্কুলে। কারণ অস্তিত্বহীন সেই ইউনিয়নে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। নদীতে জেগে ওঠা সদ্য চরে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাও সম্ভব নয়। কিন্তু অনন্ত জলিলের মতন সেই অসম্ভবকে সম্ভব করা হচ্ছে ভোটের মাধ্যমে। অনেকে বলতে পারেন, মৃত মানুষেরা কবর থেকে উঠে ভোট দিতে পারলে, অস্তিত্বহীন ইউনিয়নে কেন ভোট হতে পারবে না? এমন প্রশ্ন একেবারেই যুক্তিহীন নয়, কি বলেন? সেই নির্বাচনের প্রার্থীরা সারা জেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মানুষের কাছে দৌড়াচ্ছেন ভোট প্রার্থনায়। একজন প্রার্থী বলেছেন, তার খুব কষ্ট হচ্ছে সারা জেলায় দৌড়াদৌড়ি করতে। আহা, সত্যিই কষ্টের ব্যাপার।
একটা ইউনিয়নের পরিধি যখন সারা জেলায় ছড়িয়ে যায়, তখন তা অবশ্যই কষ্টের। অদ্ভুত একটা অবস্থা। যে অবস্থায় চারিদিকে শুধু হতাশার কথা শুনি। এমনকি আশার মধ্যেও মিশে থাকে হতাশার আলাপ। যেমন পদ্মা সেতু, বড়ই আশার কথা। কিন্তু দশ হাজার কোটি টাকার খরচ যখন চল্লিশ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়, তখন অজান্তেই হতাশা ভর করে। কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বললেন, সংসদ সদস্যকে তিনি এলাকা থেকে সরে যেতে বাধ্য করতে পারছেন না। আরেকজন বললেন, তাকে কি টেনেহিঁচড়ে বের করে দেব, এমন কথা। তাহলে কে বের দেবে? এরও কোনো জবাব নেই। হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চের বিচারকদ্বয় একটি ঋণ জালিয়াতির মামলার জামিন শুনানিকালে দুর্নীতি নির্মূল প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘আমরা একা যুদ্ধ করে কী করব।’ দেশের গণমাধ্যম ভরসার প্রধান দুটি জায়গা থেকে যখন এমন হতাশার কথা উদ্ধৃত করে তখন সাধারণ মানুষের মনের অবস্থা কী দাঁড়ায়? মানুষের ভরসার জায়গা আর কোথায় থাকে? ভোটের নিরপেক্ষতা রক্ষা করা যাচ্ছে না। দুর্নীতি দমনও সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় কী আর করা জীবনানন্দ দাশকে স্মরণ করা ছাড়া। যিনি বলেছিলেন, ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ, যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.