কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর মামলার বাদী মুক্তিযোদ্ধা মানিকের লাশ দাফনে জামায়াতের বাধা

প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৩:১৪ (বুধবার)

পিরোজপুরে কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বাদী ও সাক্ষী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন এবং রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জামায়াত-শিবিরের স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। পরিবারের অভিযোগ, বাধার মুখে রাতের অন্ধকারে মোবাইল ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে তাঁর বোন ও মেয়েদের কবর খুঁড়তে হয়েছে। পরে গভীর রাতে পারিবারিক বাড়িতে তাঁকে দাফন করা হয়।

মানিক পশারীর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। তাঁর বাড়ি পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চিতলিয়া গ্রামে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। প্রায় দুই মাস অসুস্থ থাকার পর শনিবার সকাল ১০টার দিকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জামাতার বাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়।

শনিবার দুপুরে তাঁর মরদেহ পিরোজপুরে পৌঁছালে রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার প্রদান এবং দাফন নিয়ে বাধা সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে পুলিশি পাহারায় মরদেহ পিরোজপুর পুলিশ লাইনে নেওয়া হয়। সেখানে বিকেলে সীমিত পরিসরে গার্ড অব অনার দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। এ সময় সংবাদকর্মীদের প্রবেশেও বিধিনিষেধ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, দাফনের জন্য কবর খোঁড়া নিয়েও বাধার মুখে পড়তে হয় তাঁদের। একপর্যায়ে রাতের অন্ধকারে মোবাইল ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে মানিক পশারীর বোন ও মেয়েরা নিজেরাই কবর খুঁড়তে নামেন। নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে পরিবারের নারীদের এভাবে কবর খোঁড়ার ঘটনা স্থানীয়ভাবে আলোচনার সৃষ্টি করেছে। পরে রোববার রাত প্রায় দুইটার দিকে নিজ বাড়ি বা গ্রামের পারিবারিক স্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে অভিযোগ উঠেছে, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আবদুর রাজ্জাক মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার দেওয়ার বিরোধিতা করেন। অন্যদিকে, পৌর কবরস্থানে তাঁর কবর খোঁড়ার উদ্যোগে জামায়াত নেতা জহিরুল হক ইউনুস ও শিবিরের সাবেক জেলা সভাপতি মাহবুবুল আলম নাঈম বাধা দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পাড়েরহাট বাজারে তাঁর পিরোজপুরে দাফনের বিরোধিতা করে শিবির নেতা মইনের নেতৃত্বে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের কথাও জানা গেছে।

তবে জামায়াতের জেলা সেক্রেটারি জহিরুল হক দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, দাফন নিয়ে আপত্তি ছিল না; আপত্তি ছিল মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া নিয়ে। তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

জামায়াত নেতা আবদুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে মানিক পশারীকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আখ্যা দেওয়া এবং তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে তিনি সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা এবং সাঈদীর মৃত্যুর জন্য মানিক পশারীকে দায়ী করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, জানাজা বা দাফনে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আপত্তি ছিল একজন কথিত ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়ার বিষয়ে।

অন্যদিকে, মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্মের স্থানীয় নেতা এবং বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গাজী কামরুজ্জামান শুভ্র এ ঘটনার জন্য জামায়াতের নেতাকর্মীদের দায়ী করেছেন। তাঁর বক্তব্য, মানিক পশারীর নাম মুক্তিযোদ্ধাদের সরকারি গেজেটে রয়েছে। একজন মৃত ব্যক্তির দাফনে বাধা দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

মানিক পশারী ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ অন্যদের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা করেছিলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০১৩ সালে সাঈদীকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে ২০১৪ সালে আপিল বিভাগ সেই সাজা পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। ২০২৩ সালে কারাবন্দি অবস্থায় সাঈদীর মৃত্যু হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা এবং মুক্তিযুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক ও উদ্বেগের কথা সামনে এসেছে। মানিক পশারীর মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান এবং দাফন নিয়ে ওঠা অভিযোগ সেই বিতর্ককে আবারও সামনে এনেছে।

এডিটর ইন চীফ: গোলাম রসুল খান

মোবাইল: +447538476881

তথ্য ও প্রযুক্তি সহযোগী - আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.