সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরাল ট্রেন্ডে অংশ নিতে মানুষ এত আগ্রহী কেন?

প্রকাশিত: ২১ অক্টোবর, ২০২৬ ০২:৪৯ (বুধবার)
সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরাল ট্রেন্ডে অংশ নিতে মানুষ এত আগ্রহী কেন?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ে নতুন কোনো ভাইরাল ট্রেন্ড। কখনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে ছবি তৈরি, কখনো জনপ্রিয় গানের সঙ্গে ভিডিও, আবার কখনো বিভিন্ন চ্যালেঞ্জে অংশ নেওয়ার প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যে। একজনের শুরু করা ট্রেন্ড অল্প সময়েই ছড়িয়ে পড়ে বন্ধু, পরিচিতজন থেকে শুরু করে লাখো মানুষের কাছে। কিন্তু জনপ্রিয় এসব ট্রেন্ড এড়িয়ে চলা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে কেন?

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনে রয়েছে অন্যকে অনুকরণ করার প্রবণতা, সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, নিজের পরিচয় প্রকাশ এবং কোনো গোষ্ঠীর অংশ হয়ে থাকার মানসিক চাহিদা। অনেক ক্ষেত্রে ট্রেন্ড মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যম হয়ে ওঠে। আবার অন্যদের থেকে পিছিয়ে পড়ার ভয়ও মানুষকে এতে অংশ নিতে উৎসাহিত করে।

কোনো ট্রেন্ডে যখন অনেক মানুষ অংশ নেন, তখন সেটিকে আকর্ষণীয় ও গ্রহণযোগ্য মনে হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। মনোবিজ্ঞানে এর সঙ্গে সামাজিক প্রমাণের ধারণা যুক্ত। অর্থাৎ, কোনো কিছু জনপ্রিয় কি না, তা বুঝতে মানুষ অন্যদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে। পরিচিতজন কিংবা প্রিয় তারকাদের একই ধরনের ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করতে দেখলে সেই ট্রেন্ডে অংশ নেওয়ার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রেন্ড অনুসরণ করার আরেকটি কারণ হলো নিজের পছন্দ ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশের সুযোগ। এআই দিয়ে ছবি তৈরি, পোশাকের ধরন বদলে ভিডিও বানানো কিংবা জনপ্রিয় গানের সঙ্গে নিজস্ব পরিবেশনা প্রকাশের মাধ্যমে মানুষ নিজেদের নতুনভাবে তুলে ধরতে পারেন। ২০২৫ সালে এআই ব্যবহার করে স্টুডিও জিবলি অ্যানিমেশনের আদলে ছবি তৈরির প্রবণতা ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল। এ ধরনের ট্রেন্ডে অংশ নিয়ে অনেকে নিজেদের পরিচিত ছবিকে ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন।

লাইক, শেয়ার ও ইতিবাচক মন্তব্যও ট্রেন্ডে অংশ নেওয়ার আগ্রহ বাড়াতে পারে। কোনো ছবি বা ভিডিও প্রকাশের পর অনেকের কাছ থেকে সাড়া পেলে ব্যবহারকারীর ভালো লাগতে পারে। এতে ভবিষ্যতে একই ধরনের কনটেন্ট তৈরির উৎসাহ তৈরি হয়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম জনপ্রিয় কনটেন্ট আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ভূমিকা রাখে। ফলে কোনো ট্রেন্ডের বিস্তার দ্রুত বাড়তে পারে।

বন্ধু বা পরিচিতজনদের সবাই যখন কোনো ট্রেন্ডে অংশ নেন, তখন কেউ কেউ মনে করেন, এতে যোগ না দিলে একটি অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হবেন। মনোবিজ্ঞানে এই অনুভূতিকে বলা হয় ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ বা ফোমো। অন্যদের আনন্দ, অভিজ্ঞতা কিংবা সামাজিক যোগাযোগ থেকে বাদ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা মানুষকে এমন ট্রেন্ডে অংশ নিতে প্রভাবিত করতে পারে, যদিও সেটি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর খুব একটা পছন্দ নয়।

তবে সব ভাইরাল ট্রেন্ড নিরাপদ নয়। কিছু চ্যালেঞ্জে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করা, বিপজ্জনক আচরণের ভিডিও তৈরি কিংবা অন্যের চাপে নিজের নিরাপত্তা উপেক্ষা করার প্রবণতা দেখা যায়। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীরা সামাজিক স্বীকৃতি ও বন্ধুদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চাপে এমন ঝুঁকি নিতে পারে। তাই কোনো ট্রেন্ড জনপ্রিয় হলেই সেটিকে নিরাপদ বা অনুসরণযোগ্য মনে করা ঠিক নয়।

অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রেন্ড ইতিবাচক ভূমিকাও রাখতে পারে। করোনাভাইরাস মহামারির সময় ঘরে বসে রান্না, অনলাইন নাচ এবং বিভিন্ন বিনোদনমূলক চ্যালেঞ্জে অংশ নেওয়া অনেকের জন্য সময় কাটানো ও অন্যদের সঙ্গে যুক্ত থাকার মাধ্যম হয়েছিল। একই ধরনের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি হতে পারে এবং একাকিত্ব কমাতেও সহায়তা করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ট্রেন্ডে অংশ নেওয়ার আগে নিজের আগ্রহ ও নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সবাই করছে বলে অংশ নেওয়ার পরিবর্তে বিষয়টি নিজের ভালো লাগার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা বিবেচনা করা উচিত। একই সঙ্গে ট্রেন্ডটি অনুসরণ করতে গিয়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মানসিক স্বস্তি ও শারীরিক নিরাপত্তা যেন ঝুঁকিতে না পড়ে, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাইরাল ট্রেন্ড মানেই অন্ধ অনুকরণ নয়। এটি হতে পারে আনন্দ, সৃজনশীলতা ও মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরির মাধ্যম। তবে নিজের ইচ্ছার পরিবর্তে অন্যের স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কিংবা পিছিয়ে পড়ার ভয় থেকে কোনো ট্রেন্ডে অংশ নেওয়া হচ্ছে কি না, সেটি বুঝতে পারাই গুরুত্বপূর্ণ।

এডিটর ইন চীফ: গোলাম রসুল খান

মোবাইল: +447538476881

তথ্য ও প্রযুক্তি সহযোগী - আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.