আওয়ামী লীগের এই দুঃসময় কেটে যাবে: সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন
সিলেট ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, চিকিৎসক ও সাবেক সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডা. দেওয়ান নুরুল হোসেন চঞ্চলের ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে যুক্তরাজ্যে এক অনলাইন শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
.png)
ডা. দেওয়ান নুরুল হোসেন চঞ্চল স্মৃতি পরিষদ যুক্তরাজ্যের উদ্যোগে মঙ্গলবার ২২ সেপ্টেম্বর লন্ডনের স্থানীয় সময় রাত ৯টায় এ শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ, সহযোগী সংগঠন, প্রগতিশীল রাজনীতিক, সাবেক ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ ও কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ অনলাইনে সভায় যুক্ত হন।
শোক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, আওয়ামী লীগের এই দুঃসময় কেটে যাবে। দলের প্রত্যেক নেতাকর্মীকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দল ও দেশের প্রয়োজনে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, কোনো দুঃসময়ই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আওয়ামী লীগের বর্তমান দুঃসময়ও শিগগিরই কেটে যাবে।
ডা. দেওয়ান নুরুল হোসেন চঞ্চল স্মৃতি পরিষদ যুক্তরাজ্যের সভাপতি লেখক গবেষক ও রাজনীতিবিদ অ্যাডভোকেট শাহ ফারুক আহমদের সভাপতিত্বে এবং সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আলীমুজ্জামানের সঞ্চালনায় সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাবেক প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ও সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী, ডা. চঞ্চলের ছোট ভাই যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা দেওয়ান গৌস সুলতান, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি হরমুজ আলী, পঁচাত্তর পরবর্তী বৃহত্তর সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সিরাজ উদ্দিন আহমদ ফরহাদ, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ নেতা ভিপি খসরুজ্জামান খসরু, সাবেক ছাত্রনেতা লেখক গবেষক সুজাত মনসুর, সাবেক ছাত্রনেতা ও হিথ্রো আওয়ামী লীগের সভাপতি শামীম আহমদ, সিলেট জেলা বারের সাবেক সভাপতি ইমাদ উল্লাহ শহিদুল ইসলাম শাহীন, নিউহাম আওয়ামী লীগের সভাপতি মোবারক আলী, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের সাবেক সহসভাপতি ও সাবেক ছাত্রনেতা গোলাম রসুল খান, যুক্তরাজ্য মহিলা লীগের যুগ্ম সম্পাদক সমিরুন চৌধুরী, আওয়ামী লীগ নেতা ও গ্রেটার ম্যানচেস্টার বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি রুহুল চৌধুরী মামুন ও সাংবাদিক সুমি খান।
.png)
সভায় উপস্থিত ছিলেন সিলেট-৩ আসনের সাবেক এমপি হাবিবুর রহমান হাবিব, সর্ব ইউরোপীয় জাসদের সভাপতি মতিউর রহমান মতিন এবং মরহুম ডা. চঞ্চলের পরিবারের সদস্য জোহি দেওয়ান।
সভায় বক্তারা ডা. দেওয়ান নুরুল হোসেন চঞ্চলের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে তাঁর ভূমিকা এবং দেশ ও মানুষের প্রতি তাঁর অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। বক্তারা বলেন, ডা. চঞ্চল আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক ছিলেন। ব্যক্তিগত লাভ-লোভ ও স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি দল, দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করেছেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন বর্তমান প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের জন্য অনুসরণীয় হয়ে থাকবে।
ডা. দেওয়ান নুরুল হোসেন চঞ্চল ১৯৩৯ সালে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার কচুয়াবহর নোয়াটিলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা দেওয়ান ইসহাক আলী এবং মাতা দেওয়ান কুলসুম বেগম। তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং ছাত্র-যুবকদের সংগঠিত করার পাশাপাশি স্বাধীনতার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৬৬ সালের ছয় দফা ও ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনের সময় তিনি সিলেটের ছাত্র ও যুবকদের মধ্যে স্বাধীনতার চেতনা ছড়িয়ে দিতে কাজ করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে কর্নেল এম এ জি ওসমানীর পক্ষে তিনি সক্রিয়ভাবে প্রচারঔ চালান। ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের সময় সিলেটে আন্দোলন সংগঠনে কর্ণেল (পরবর্তীতে জেনারেল এবং মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি) এম এ জি ওসমানী, আব্দুস সামাদ আজাদ, দেওয়ান ফরিদ গাজী, অ্যাডভোকেট আব্দুর রহিম, অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান, সিরাজ উদ্দীন আহমদ সহ তৎকালীন নেতাদের সঙ্গে তিনি কাজ করেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সিলেটের ছাত্র ও যুবকদের সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করা এবং প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পাঠানোর ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল বলে বক্তারা স্মরণ করেন।
স্বাধীনতার পর ডা. চঞ্চল সিলেট জেলা ছাত্রলীগ ও যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং যুবলীগের কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। স্বাধীনতার পর দেশ পুনর্গঠনের কাজেও তিনি যুক্ত ছিলেন এবং সিলেটে রিলিফ অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। রাজনীতির পাশাপাশি ফুটবল খেলা ও কবিতা লেখার প্রতিও তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল।
১৯৭৫ সালের পর রাজনৈতিক প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি সিলেটে আওয়ামী লীগের সংগঠন পুনর্গঠনে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ইনামুল হক চৌধুরী বীর প্রতীকের পক্ষে তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জেনারেল এম এ জি ওসমানী এবং ১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ড. কামাল হোসেনের পক্ষে কাজ করেন। ১৯৮২ সালে এইচ এম এরশাদের ক্ষমতা দখলের পর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
শোকসভায় বক্তারা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য রাখেন। তাঁরা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর জেল-জুলুম ও নির্যাতন বন্ধের দাবি জানান এবং দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
বক্তারা আরও বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিসেম্বর মাসে দেশে ফিরবেন। তাঁর দেশে ফেরার পথ কণ্টকমুক্ত করতে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের এগিয়ে আসতে হবে। দল ও দেশের স্বার্থে সকল বিভেদ ভুলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তাঁরা।
বক্তারা বলেন, ডা. দেওয়ান নুরুল হোসেন চঞ্চল ছিলেন ত্যাগ, সততা ও আদর্শের রাজনীতির একজন প্রতীক। রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি সংগঠন ও মানুষের পাশে থেকেছেন। তাঁর মতো নিবেদিতপ্রাণ সংগঠকদের জীবন ও রাজনৈতিক আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন।
সভাপতির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট শাহ ফারুক আহমদ বলেন, ডা. চঞ্চলের রাজনৈতিক জীবন ছিল দেশ, মানুষ ও সংগঠনের প্রতি নিবেদিত। তাঁর মতো নির্লোভ ও ত্যাগী রাজনৈতিক সংগঠকের জীবন থেকে বর্তমান প্রজন্মের অনেক কিছু শেখার আছে। তাঁর স্মৃতি ও রাজনৈতিক অবদান সংরক্ষণে ডা. দেওয়ান নুরুল হোসেন চঞ্চল স্মৃতি পরিষদ যুক্তরাজ্য কাজ করে যাবে।
সাধারণ সম্পাদক আলীমুজ্জামান বলেন, ডা. চঞ্চল ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণমানুষের রাজনীতিতে বিশ্বাসী একজন সংগঠক। সিলেটের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর অবদানকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে আরও আলোচনা ও গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
ডা. দেওয়ান নুরুল হোসেন চঞ্চল ১৯৮৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।
সভায় তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হয়। একই সঙ্গে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতাকর্মীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.